বিজ্ঞাপন
আমেরিকান পণ্য বয়কট করছেন কানাডিয়ানরা, নতুন দেশ থেকে পণ্য আনছে সুপারমার্কেটগুলো
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৬ এএম
বিজ্ঞাপন
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেই কানাডায় আমেরিকান পণ্য বয়কটের প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে। দেশটির অনেক ক্রেতা এখন সম্ভব হলে আমেরিকান পণ্য না কিনে কানাডার স্থানীয় পণ্য বেছে নিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে সুপারমার্কেটগুলোতেও। ক্রেতাদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে দোকানগুলো কানাডার পণ্য বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
কানাডার অন্টারিওর স্বাধীন মুদি দোকান প্রতিষ্ঠান ভিন্সেস মার্কেটের প্রেসিডেন্ট জিয়ানকার্লো ত্রিমার্কি জানান, আমেরিকান পণ্য রাখায় ক্ষুব্ধ হয়ে সম্প্রতি অনেক ক্রেতা তাদের কাছে ই-মেইল ও মন্তব্য পাঠিয়েছেন। এর জবাবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তাদের দোকানের বেশিরভাগ কৃষিপণ্যই কানাডায় উৎপাদিত।
ত্রিমার্কির চারটি দোকানে এখন প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষিপণ্যই কানাডার। আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা স্ট্রবেরির পরিবর্তে তারা এখন কুইবেক থেকে স্ট্রবেরি সংগ্রহ করছেন। তবে স্থানীয় পণ্য সংগ্রহের কারণে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিজ্ঞাপনের বাজেটও কমাতে হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে দোকানগুলোকে পণ্যের মান ও দামের মধ্যে ভারসাম্য করতে হতো। এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পণ্যটি কোন দেশের—সেই বিষয়টিও।
কানাডার সবচেয়ে বড় খাদ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান লব্লও আগস্টে তাদের ফল ও তাজা খাবারের বিভাগে কানাডিয়ান পণ্য চিহ্নিত করতে ম্যাপল পাতার বড় সাইন আবার চালু করেছে। পাশাপাশি শুল্কের আওতায় পড়া পণ্য চিহ্নিত করতে ‘টি’ ট্যাগও ফিরিয়ে আনা হয়েছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম মুদি বিক্রেতা মেট্রোও জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা কানাডার স্থানীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দেবে।
কানাডিয়ান ফেডারেশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট গ্রোসার্সের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গ্যারি স্যান্ডস বলেন, কানাডার মানুষের চিন্তাভাবনায় স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে।
ট্রাম্প কানাডার পণ্যে শুল্ক আরোপের পর গত বছরের শুরু থেকেই ‘বাই কানাডিয়ান’ বা কানাডিয়ান পণ্য কেনার আন্দোলন শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ার পর সেই প্রবণতা আরও বেড়েছে।
কানাডা বিশ্বের অন্যতম বড় তাজা সবজি আমদানিকারক দেশ। দেশটির তাজা সবজির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী এখনো যুক্তরাষ্ট্র। তবে কানাডার মোট সবজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ জুলাইয়ে কমে ৬২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ২০২৩ সালের একই সময়ে এই হার ছিল ৬৯ শতাংশ।
কানাডার ফল আমদানির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। তবে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কানাডার ব্যবসায়ীরা এখন বিকল্প উৎস খুঁজছেন।
টরন্টোর সফটওয়্যার প্রকৌশলী জন অ্যামবার্ড বলেন, তিনি যতটা সম্ভব আমেরিকান পণ্য এড়িয়ে চলছেন এবং কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডকে সমর্থন করছেন। কোনো পণ্য কেনার আগে তিনি লেবেল দেখছেন এবং সেটি কানাডায় তৈরি কি না, তা জানতে অনলাইনেও খোঁজ করছেন।
কানাডার শীতকাল দীর্ঘ ও কঠিন হওয়ায় সারা বছর স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কৃষিপণ্য উৎপাদন করা সহজ নয়। এ কারণে এতদিন দেশটির সুপারমার্কেটগুলো শীতের সময়ে গ্রিনহাউসের পণ্য, সংরক্ষিত সবজি কিংবা আমদানির ওপর বেশি নির্ভর করত। আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোর একটি।
তবে আমেরিকান পণ্য বয়কটের কারণে এখন স্পেন, ব্রাজিল ও হন্ডুরাসের মতো দেশ থেকেও বেশি পণ্য আনছে কিছু কানাডিয়ান দোকান।
মাইক ডিন লোকাল গ্রোসারের মালিক গর্ডন ডিন বলেন, নতুন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়ে যাওয়ার পর ব্যবসায়ীরা আবার সহজে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো সরবরাহব্যবস্থায় ফিরে যাবেন—এমনটা মনে হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের ফলে সরবরাহব্যবস্থা আরও বৈচিত্র্যময় ও নিরাপদ হয়েছে।
কানাডা সরকারও স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে আগামী ১০ বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার বিনিয়োগ করছে। বিশেষ করে শীতের সময়ে উৎপাদন বাড়াতে গ্রিনহাউস তৈরিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি খাদ্যের মূল্যস্ফীতি কমাতে দেশের অভ্যন্তরে খাদ্য সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
তবে কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের আলাদা নিয়মকানুন এবং খাদ্য পরিবহনের কিছু বিধিনিষেধের কারণে দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য সরবরাহ করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ইউনিভার্সিটি অব গেলফের অধ্যাপক মাইক ভন ম্যাসো বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনা কমলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে পারে। কারণ অনেক আমেরিকান পণ্য এখনো অন্যান্য দেশের বিকল্পের তুলনায় সস্তা।
তবে তার মতে, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে গেলেও কানাডিয়ানদের আমেরিকান পণ্যের প্রতি আগের নির্ভরতা আর নাও ফিরতে পারে।