বিজ্ঞাপন
অবৈধ অভিবাসীর হাতে নারীর মৃত্যু, প্রশ্নের মুখে ক্যালিফোর্নিয়ার অভিবাসন নীতি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির শিকার এক নারীকে হত্যার ঘটনায় রাজ্যটির অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ৩৮ বছর বয়সী শালিনী ঠাকুরকে গত ৮ সেপ্টেম্বর স্যাক্রামেন্টোর একটি শপিং সেন্টারের বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ থাকা ২২ বছর বয়সী রোহিত রোহিত পরে পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের সময় নিজের গুলিতে মারা যান বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
মামলাটিতে শালিনীর পরিবারের পক্ষ থেকে আগে থেকেই প্রশাসনের কাছে সাহায্য চাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, রোহিতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ, হয়রানি, তাঁর গাড়িতে হস্তক্ষেপ এবং হুমকির অভিযোগ করেছিলেন শালিনী। মে মাসে তিনি রোহিতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আদেশও নিয়েছিলেন। জুলাইয়ে সেই আদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনি আবার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
স্যাক্রামেন্টো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর হাও অ্যাভিনিউ ও নর্থরপ অ্যাভিনিউ এলাকার একটি শপিং সেন্টারে গুলির ঘটনা ঘটে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, শালিনী কর্মস্থলে পৌঁছানোর পর রোহিত তাঁর কাছে এগিয়ে যান। তিনি পালানোর চেষ্টা করলে রোহিত তাঁকে অনুসরণ করে গুলি করেন। পরে রোহিত গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। পুলিশ দ্রুত তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে এবং হাইওয়ে ৫০ এলাকায় তাঁর গাড়ি থামায়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের পর তিনি নিজের গুলিতে মারা যান বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
স্যাক্রামেন্টো কাউন্টি করোনার অফিস বৃহস্পতিবার নিহত নারীর পরিচয় শালিনী ঠাকুর হিসেবে নিশ্চিত করে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর পরিবারের সদস্যদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, শালিনী ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান এবং তাঁর মা দীর্ঘদিন ধরে মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
এদিকে শুক্রবার মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ জানায়, রোহিত ভারতের নাগরিক এবং ২০২৩ সালে অ্যারিজোনা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। সীমান্তে তাঁকে আটক করেছিল মার্কিন সীমান্তরক্ষী বাহিনী। তবে পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন।
এই তথ্য প্রকাশের পর ক্যালিফোর্নিয়ার তথাকথিত ‘অভয়ারণ্য আইন’ বা স্যাংচুয়ারি নীতিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। ফেডারেল কর্মকর্তারা যুক্তি দিচ্ছেন, রাজ্য ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা সীমিত থাকায় অভিবাসন আইন প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে ক্যালিফোর্নিয়ার আইন সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব আইন স্থানীয় পুলিশকে অপরাধ তদন্ত বা অপরাধের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা থেকে বিরত রাখে না। ২০১৭ সালে কার্যকর হওয়া সিনেট বিল ৫৪, যা ‘ক্যালিফোর্নিয়া ভ্যালুজ অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত, মূলত রাজ্য ও স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগে সহায়তার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। আইনটিতে নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এসব বিধান স্থানীয় পুলিশকে অপরাধ তদন্ত, আটক বা গ্রেপ্তার থেকে বিরত রাখে না। তবে অভিবাসন আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তিকে তদন্ত, আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্থাগুলোর ভূমিকা সীমিত করা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফেডারেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগও রয়েছে।
ফেডারেল কর্মকর্তাদের সমালোচনার একটি বড় অংশ স্থানীয় কারাগার থেকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যক্তিকে হস্তান্তর এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার নিয়মকে ঘিরে। ক্যালিফোর্নিয়ার আইন অনুযায়ী, সাধারণভাবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষে শুধু ফেডারেল অভিবাসন অনুরোধের ভিত্তিতে কাউকে অতিরিক্ত সময় আটক রাখা বা হস্তান্তর করা সীমিত। তবে বৈধ বিচারিক পরোয়ানা বা আইনে নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত থাকলে ভিন্ন ব্যবস্থা হতে পারে।
ফেডারেল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে এই সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় ‘অপারেশন গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট অব ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ৭৬৯টি ফেডারেল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং ৩৬২ জনকে স্থানীয় কারাগার থেকে ফেডারেল হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩৪৭ জনের বিরুদ্ধে অপসারণের পর অবৈধভাবে আবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা বা অন্য কোনো ফেডারেল অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে এই কর্মসূচি বর্তমানে মূলত দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সাতটি কাউন্টিতে কার্যকর। ফলে স্যাক্রামেন্টোসহ উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার ক্ষেত্রে এর সরাসরি প্রভাব নেই। এই সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শালিনী ঠাকুরের ঘটনাটি স্যাক্রামেন্টো কাউন্টিতে ঘটেছে।
শালিনী হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে এখনো এমন কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাংচুয়ারি আইন সরাসরি তাঁর হত্যাকাণ্ডের কারণ হয়েছে। বরং নিশ্চিতভাবে যা জানা যাচ্ছে তা হলো, তিনি রোহিতের বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশ নিয়েছিলেন এবং জুলাইয়ে সেই আদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগও জানিয়েছিলেন। পরে সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখে তিনি গুলিতে নিহত হন।
ঘটনাটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব এবং জননিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে সামনে এনেছে। ফেডারেল কর্মকর্তারা স্থানীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে আরও বেশি সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়া সরকার বলছে, স্থানীয় পুলিশকে মূলত স্থানীয় অপরাধ মোকাবিলায় মনোযোগ দেওয়া উচিত এবং ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগ ফেডারেল সরকারের দায়িত্ব।
শালিনী ঠাকুর হত্যার তদন্ত এবং তাঁর আগে করা অভিযোগগুলো নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ক্যালিফোর্নিয়ার অভিবাসন নীতির কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: কেসিএএআর