বিজ্ঞাপন
কাজে এসে কাজ শেষেই ফিরতে হবে দেশে, রাশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের জন্য আসছে নতুন নিয়ম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
বিজ্ঞাপন
শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মীদের নিয়ে নতুন একটি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করেছে রাশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিদেশি শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কাজের জন্য রাশিয়ায় আনা হবে এবং কাজের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।.
রাশিয়ার প্রথম উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অভিবাসনবিষয়ক বিভাগের প্রধান আন্দ্রেই কিকোত বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে এ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। পুতিন প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটিকে ‘সভ্য পদ্ধতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বলে নিউজউইকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো রুশ প্রতিষ্ঠান বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রীয় অভিবাসন পরিষেবার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। এরপর বিশেষায়িত একটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় শ্রমিক খুঁজে দেবে। কর্মীর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁকে রাশিয়ায় নিয়ে আসা হবে এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হবে।
কর্মীদের জন্য নির্ধারিত আবাসনের ব্যবস্থা করবে নিয়োগকর্তা। কর্মস্থলে যাতায়াতের ব্যবস্থাও থাকবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে কর্মীকে আবার রাশিয়ার বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
কিকোত এই ব্যবস্থাকে ‘বাড়ি, কাজ, বাড়ি’ মডেল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পরিকল্পনাটি আগামী বছর থেকে ধাপে ধাপে চালু করার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবটি এখনো রুশ পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয়নি।
রাশিয়ায় বর্তমানে শ্রমিকের ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। দেশটির বেকারত্বের হার মে মাসে ঐতিহাসিকভাবে কমে ২ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছিল। বর্তমানে তা প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থনৈতিক উন্নয়নমন্ত্রী মাকসিম রেশেতনিকভ চলতি মাসের শুরুতে রাশিয়াকে ‘শ্রমিক ঘাটতির অর্থনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
এই সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিপুলসংখ্যক রুশ নাগরিক সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট পুতিন জুনে জানিয়েছিলেন, ৭ লাখের বেশি রুশ সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন রয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ২ লাখ মানুষ সামরিক বাহিনীতে চুক্তিভিত্তিকভাবে যোগ দিয়েছেন।
একই সময়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পের সম্প্রসারণও বেসামরিক খাত থেকে কর্মী টেনে নিচ্ছে। ফলে বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় কর্মী পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন। রাশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দ্রুত কমে যাচ্ছে। ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা চলতি দশকের শেষ নাগাদ প্রায় ৬৩ লাখ কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী তাতিয়ানা গোলিকোভা জানিয়েছেন, ২০৩২ সালের মধ্যে অবসর নেওয়া প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ কর্মীর জায়গা পূরণ করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশি শ্রমিক আনা রাশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে। তবে অভিবাসন নীতিতে মস্কোর সাম্প্রতিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে কঠোর।
পুতিনের একটি ডিক্রিতে রাশিয়ার জনসংখ্যা ও শ্রমবাজার বৃদ্ধির প্রধান উৎস হিসেবে দেশের নিজস্ব জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশটির পার্লামেন্ট জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে অভিবাসন নিয়ে ২২টি পৃথক আইন পাস করা হয়েছে।
কিকোত পুতিনকে জানিয়েছেন, গত ১৮ মাসে প্রায় ১ লাখ বিদেশিকে রাশিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজারকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়েছে।
নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে রাশিয়া একদিকে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মী নিতে চায়, অন্যদিকে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসনে উৎসাহিত করতে চায় না। ফলে বিদেশি শ্রমিকদের নির্দিষ্ট চাকরি ও চুক্তির সঙ্গে যুক্ত রেখে কাজ শেষ হওয়ার পর দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও এ ব্যবস্থার কিছু মিল রয়েছে। দেশটিতে নির্দিষ্ট খাতের জন্য এইচ-২ ভিসায় বিদেশি অস্থায়ী কর্মীরা কাজ করতে পারেন। ২০২৬ অর্থবছরের জন্য মার্কিন সরকার অতিরিক্ত ৬৪ হাজার ৭১৬টি এইচ-২বি অস্থায়ী কর্মী ভিসার অনুমতি দিয়েছে। এর কারণ হিসেবে কর্মী সংকটের কথা জানিয়েছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান হারানো বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু বিদেশি কর্মীর জন্য তুলনামূলক বেশি সুযোগ রয়েছে। বাইডেন প্রশাসনের সময় চালু হওয়া নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ভিসায় থাকা কর্মীরা চাকরি হারানোর পর সাধারণত ৬০ দিন পর্যন্ত নতুন নিয়োগকর্তা খোঁজার সুযোগ পেতেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রেও সম্প্রতি এ বিষয়ে পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ বিভিন্ন ভিসা শ্রেণির কর্মীদের জন্য ৬০ দিনের এই সময়সীমা বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরির ভিত্তি শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হতে পারে। তবে এইচ-২ ভিসার কর্মীদের জন্য ৬০ দিনের সুরক্ষা বহাল রাখার কথা প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের জন্য ইতিমধ্যে আরও কিছু কঠোর নিয়ম চালু হয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর করের বোঝা বাড়ানোর একটি আইন পুতিন জুলাইয়ে স্বাক্ষর করেছেন। রাশিয়ায় থাকা নির্ভরশীল প্রতিটি সন্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের মাসিক করের পরিমাণ আরও ৫০ শতাংশ বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া অভিবাসী শ্রমিকদের সন্তানদের রুশ স্কুলে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রেও গত বছর থেকে কঠোর নিয়ম চালু করা হয়েছে। রুশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এসব নিয়ম চালুর পর কর্মহীন অভিবাসীদের সংখ্যা কমেছে।
তবে নতুন প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে রাশিয়ায় বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের ধরন আরও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। কর্মীদের নিজস্বভাবে চাকরি খোঁজা বা এক নিয়োগকর্তা থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও রাশিয়া একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন কমিয়ে রাখতে চাইছে। প্রস্তাবিত ‘বাড়ি, কাজ, বাড়ি’ মডেল সেই দুই নীতির মধ্যে সমন্বয় করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: নিউজউইক