বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার বদলে ৩২ ঘণ্টা কাজের প্রস্তাব, কংগ্রেসে নতুন বিল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৯ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসপ্তাহ ৪০ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৩২ ঘণ্টা করার প্রস্তাব উঠেছে কংগ্রেসে। নতুন এই বিল পাস হলে নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মীরা সপ্তাহে ৩২ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে অতিরিক্ত সময়ের জন্য দেড় গুণ হারে পারিশ্রমিক পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এটি কার্যকর হলে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে সপ্তাহে চার দিন কাজ করতে হবে, এমন নয়।
‘থার্টি-টু আওয়ার ওয়ার্কউইক অ্যাক্ট’ নামের বিলটি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রতিনিধি পরিষদে পুনরায় উত্থাপন করেন ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি মার্ক তাকানো। একই উদ্যোগে সিনেটে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভার্মন্টের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত বিলটি শিক্ষা ও কর্মশক্তি বিষয়ক কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবটির মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার সীমা ধীরে ধীরে ৪০ ঘণ্টা থেকে ৩২ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। তবে পরিবর্তনটি একবারে হবে না। বিল অনুযায়ী, আইন কার্যকর হওয়ার পর প্রথম পর্যায়ে সপ্তাহে ৩৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে অতিরিক্ত সময়ের পারিশ্রমিক প্রযোজ্য হবে। দ্বিতীয় বছরে সীমা হবে ৩৬ ঘণ্টা এবং তৃতীয় বছরে ৩৪ ঘণ্টা। এরপর চতুর্থ পর্যায় থেকে ৩২ ঘণ্টার বেশি কাজ করলেই অতিরিক্ত সময়ের পারিশ্রমিক দেওয়ার নিয়ম কার্যকর হবে।
বর্তমান মার্কিন ফেডারেল আইনে অধিকাংশ অতিরিক্ত সময়ের পারিশ্রমিকের আওতাভুক্ত কর্মীকে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার বেশি কাজের জন্য স্বাভাবিক মজুরির অন্তত দেড় গুণ দিতে হয়। প্রস্তাবিত আইনে এই সীমা কমে ৩২ ঘণ্টায় নেমে আসবে।
অর্থাৎ, আইনটি পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর কোনো আওতাভুক্ত কর্মী সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ করলে ৩২ ঘণ্টার পরের ৮ ঘণ্টার জন্য অতিরিক্ত সময়ের পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা। একই সঙ্গে দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কর্মী দিনে আট ঘণ্টার বেশি এবং সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা কাজ করলে অতিরিক্ত সময়ের জন্য স্বাভাবিক হারের দেড় গুণ পারিশ্রমিক দিতে হবে। ১২ ঘণ্টার বেশি কাজের ক্ষেত্রে তা দ্বিগুণ হারে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
তবে প্রস্তাবটি সরাসরি চার দিনের কর্মসপ্তাহ বাধ্যতামূলক করছে না। কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে ৩২ ঘণ্টার কাজ চার দিনে ভাগ করে দিতে পারে, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যভাবেও কর্মঘণ্টা সাজাতে পারে। মূল পরিবর্তনটি হবে অতিরিক্ত সময়ের পারিশ্রমিকের নিয়মে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিলটি সব কর্মীর ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে না। এটি ১৯৩৮ সালের ফেয়ার লেবার স্ট্যান্ডার্ডস অ্যাক্ট সংশোধনের মাধ্যমে কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই আইনে ইতিমধ্যেই কিছু নির্বাহী, প্রশাসনিক ও পেশাজীবী কর্মীসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মী অতিরিক্ত সময়ের পারিশ্রমিকের নিয়ম থেকে অব্যাহতি পান। ফলে নতুন প্রস্তাবটিও সংশ্লিষ্ট আইনি শ্রেণিবিন্যাসের আওতাভুক্ত কর্মীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
প্রস্তাবে কর্মীদের বেতন ও সুবিধা সুরক্ষার বিষয়টিও রাখা হয়েছে। কর্মসপ্তাহের নতুন সীমার আওতায় আসার কারণে কোনো কর্মীর মোট সাপ্তাহিক পারিশ্রমিকের হার বা অন্যান্য সুবিধা কমিয়ে দেওয়ার সুযোগ না রাখার কথা বলা হয়েছে।
৩২ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহের ধারণাটি যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নয়। মার্ক তাকানো ২০২১ সালেও একই ধরনের বিল প্রতিনিধি পরিষদে তুলেছিলেন। ২০২৪ সালে বার্নি স্যান্ডার্স সিনেটে এ বিষয়ে আলাদা বিল উত্থাপন করেন। এর আগে ২০২৩ সালেও প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটি আবার তোলা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান ৪০ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহও একদিনে চালু হয়নি। ১৯৩৮ সালের ফেয়ার লেবার স্ট্যান্ডার্ডস অ্যাক্টে শুরুতে অতিরিক্ত সময়ের সীমা ৪৪ ঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে তা ধাপে ধাপে কমে ৪০ ঘণ্টায় আসে, যা দীর্ঘদিন ধরে দেশটির প্রচলিত ফেডারেল মানদণ্ড।
প্রস্তাবটির সমর্থকদের যুক্তি হলো, প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। তাই প্রযুক্তি থেকে পাওয়া উৎপাদনশীলতার সুফলের একটি অংশ কর্মীদের কম কর্মঘণ্টা ও উন্নত জীবনযাপনের মাধ্যমে পাওয়া উচিত।
স্যান্ডার্স বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আর্থিক সুফল শুধু বড় প্রতিষ্ঠান বা ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মজীবী পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নেও ব্যবহার করা উচিত।
তবে প্রস্তাবটির বিরোধিতাও রয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের এক সিনেট শুনানিতে রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি সতর্ক করেছিলেন, বেতন অপরিবর্তিত রেখে কর্মঘণ্টা কমানো হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শ্রম ব্যয় বাড়তে পারে। এর ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম বাড়াতে, নতুন নিয়োগ কমাতে কিংবা অন্য জায়গায় কাজ সরিয়ে নিতে পারে বলে তিনি যুক্তি দেন।
এদিকে কম কর্মঘণ্টার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চল ও বিশ্বের অন্যান্য দেশেও হয়েছে। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সান জুয়ান কাউন্টি ২০২৩ সালে কর্মীদের একটি অংশের জন্য ৩২ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ চালু করে। পরে ২০২৫ সালের শেষ দিকে কাউন্টি কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা এই ব্যবস্থা স্থায়ী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এতে অসুস্থতাজনিত ছুটি কমা এবং চাকরির আবেদন বাড়ার মতো কিছু ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তবে কর্মসূচিতে কর্মীদের সময়সূচি ও জনসেবা চালু রাখার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার কথাও স্বীকার করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যেও ২০২২ সালে ৬১টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ২ হাজার ৯০০ কর্মীকে নিয়ে কম কর্মঘণ্টার একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালায়। সেখানে বেতন না কমিয়ে কাজের সময় ২০ শতাংশ কমানো হয়েছিল। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রতিবেদনে ওই পরীক্ষায় অসুস্থতাজনিত ছুটি এবং কর্মী চলে যাওয়ার হার কমার কথা উঠে আসে। তবে সেটি ছিল স্বেচ্ছামূলক পরীক্ষা, কোনো জাতীয় আইন নয়।
বর্তমান বিলটি এখনো আইন হয়নি। প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপনের পর এটি সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। এরপর কমিটির পর্যালোচনা, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরসহ আরও কয়েকটি ধাপ পেরোতে হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের জন্য ৩২ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ কবে বাস্তবে কার্যকর হবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
সূত্র: নিউজউইক