বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের চাকরি নিয়ে নতুন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৫ এএম
বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্ক শহরে বাংলাদেশি অভিবাসীদের কর্মসংস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক সিটি পরিকল্পনা বিভাগ। ২০২৩ সালের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশি পুরুষদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার শহরের সামগ্রিক পুরুষ জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। একই সঙ্গে বাংলাদেশি পুরুষ ও নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি চাকরিতেও যুক্ত রয়েছেন।
নিউইয়র্ক সিটির ‘নিউইয়েস্ট নিউইয়র্কার্স ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিউইয়র্ক শহরে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৪৪২। এর মধ্যে ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশি পুরুষের সংখ্যা ছিল ৪৮ হাজার ২৭৩ জন। তাদের মধ্যে ৩৬ হাজার ৩৭৮ জন শ্রমশক্তির অংশ ছিলেন। অর্থাৎ বাংলাদেশি পুরুষদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে পুরো নিউইয়র্ক শহরের পুরুষদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশি পুরুষদের কর্মবাজারে অংশগ্রহণের প্রবণতা শহরের গড়ের চেয়ে বেশি। এই তথ্য বাংলাদেশি কমিউনিটির কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।
তবে শুধু চাকরির সংখ্যা নয়, বাংলাদেশিরা কী ধরনের কর্মসংস্থানে যুক্ত—সেটিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি পুরুষ কর্মীদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ স্বনিয়োজিত। শহরের বিভিন্ন অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলাদেশি পুরুষদের স্বনিয়োজনের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি পাকিস্তানি, রুশ ও কোরীয় পুরুষদের মধ্যেও স্বনিয়োজনের হার তুলনামূলকভাবে উঁচু বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বনিয়োজন বলতে সাধারণত নিজের ব্যবসা বা নিজের উদ্যোগে কাজ করাকে বোঝায়। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে ছোট ব্যবসা, দোকান, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন সেবা এবং অন্যান্য উদ্যোক্তা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ জীবিকার উৎস। সরকারি পরিসংখ্যানও এই উদ্যোক্তা প্রবণতার একটি প্রমাণ দিচ্ছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি চাকরিতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্ক শহরের বিদেশে জন্ম নেওয়া পুরুষ কর্মীদের মধ্যে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ সরকারি চাকরিতে ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশি পুরুষ কর্মীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশি পুরুষদের সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণ শহরের বিদেশে জন্ম নেওয়া পুরুষ কর্মীদের গড়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
শুধু পুরুষদের ক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশি নারীদের ক্ষেত্রেও সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি নারী কর্মীদের প্রায় ১৬ শতাংশ সরকারি চাকরিতে ছিলেন। নিউইয়র্ক শহরের বিদেশে জন্ম নেওয়া নারী কর্মীদের সামগ্রিক সরকারি চাকরির হার ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশি নারীদের ক্ষেত্রেও সরকারি চাকরির অংশগ্রহণ বিদেশে জন্ম নেওয়া নারীদের গড়ের চেয়ে বেশি ছিল।
বাংলাদেশি নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার অবশ্য পুরুষদের তুলনায় কম। ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ শ্রমশক্তির অংশ ছিলেন। একই বয়সী নিউইয়র্ক শহরের নারীদের সামগ্রিক শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৬০ দশমিক ১ শতাংশ।
কর্মক্ষেত্রের ধরনেও বাংলাদেশিদের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশি নারীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিক্রয় ও দাপ্তরিক ধরনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশি নারীদের একটি বড় অংশ সেবা খাতেও কাজ করছিলেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশি নারীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিক্রয় ও দাপ্তরিক পেশায় ছিলেন, যা বিদেশে জন্ম নেওয়া নারীদের সামগ্রিক হারের তুলনায় বেশি।
আয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। ২০২৩ সালে নিউইয়র্ক শহরে পূর্ণকালীন কর্মরত বাংলাদেশি পুরুষদের মধ্যম বার্ষিক আয় ছিল ৪৯ হাজার ৬১৩ ডলার। একই শ্রেণির বাংলাদেশি নারীদের মধ্যম বার্ষিক আয় ছিল ৪২ হাজার ৫৫১ ডলার। তুলনায় নিউইয়র্ক শহরের সব পূর্ণকালীন কর্মরত পুরুষের মধ্যম আয় ছিল ৬৭ হাজার ৫৭৯ ডলার এবং নারীদের ৬৪ হাজার ৭২২ ডলার।
এই ব্যবধানের পেছনে শিক্ষা, ইংরেজি দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে প্রবেশের সময়ের মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। নিউইয়র্ক সিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন অভিবাসীদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে প্রবেশের পর প্রথম দিকে ভাষাগত সীমাবদ্ধতা বা বিদেশি শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতির সমস্যার মুখোমুখি হন। সময়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে অনেকে উচ্চতর পেশায় যাওয়ার সুযোগ পান।
বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো নিউইয়র্কে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। নিউইয়র্ক সিটির আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া নিউইয়র্কবাসীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশিরা শহরের অন্যতম বড় অভিবাসী জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি বড় অংশ নিউইয়র্কে কেন্দ্রীভূত। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অভিবাসীদের প্রায় তিনজনের একজন নিউইয়র্ক শহরে বসবাস করছিলেন। ফলে নিউইয়র্কের কর্মসংস্থানের এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশি অভিবাসী কমিউনিটির জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
তবে এই পরিসংখ্যানকে ‘আজকের চাকরির বাজার’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তথ্যগুলো ২০২৩ সালের জনসংখ্যা ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০২৬ সালে চাকরির বাজার, মজুরি, অভিবাসন নীতি এবং বিভিন্ন পেশায় নিয়োগের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। তাই এই তথ্য বাংলাদেশি কমিউনিটির দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের চিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট চাকরির সুযোগ বা বেতন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সর্বশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও সরকারি তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
নিউইয়র্ক সিটির সরকারি তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে—বাংলাদেশি কমিউনিটি শুধু বেসরকারি চাকরি বা ছোট ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল নয়। বাংলাদেশি পুরুষ ও নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি চাকরিতেও যুক্ত এবং পুরুষদের মধ্যে স্বনিয়োজনের প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে বেশি। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগামী দিনে সরকারি চাকরি, পেশাগত প্রশিক্ষণ, ব্যবসা এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।