বিজ্ঞাপন
এইচ-১বি ভিসার নিয়ম ভাঙায় যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ৫ প্রতিষ্ঠান, বিপাকে পড়তে পারেন বিদেশি কর্মীরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২২ পিএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম আইন ও এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির নিয়ম ভঙ্গের কারণে বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে এইচ-১বি কর্মসূচিতে নতুন কর্মী নেওয়া বা সংশ্লিষ্ট সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করেছে দেশটির শ্রম বিভাগ। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সরকারি তালিকা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর এক থেকে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের মজুরি ও কর্মঘণ্টা বিভাগ (WHD) প্রতি মাসে এইচ-১বি কর্মসূচি থেকে নিষিদ্ধ বা অযোগ্য ঘোষিত প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করে। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর সর্বশেষ তালিকায় রয়েছে গোয়ারাটেক এলএলসি, রেনোটেক গ্রুপ এলএলসি, সিলোজ ইনক., শেরউড অ্যাট মাউন্ট ডোরা ইনক. এবং দা ভিঞ্চি অ্যাট হান্টার্স ক্রিক ইনক.
শ্রম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গোয়ারাটেক এলএলসিকে ১২ মে ২০২৫ থেকে ১১ মে ২০২৭ পর্যন্ত, রেনোটেক গ্রুপ এলএলসিকে ৮ আগস্ট ২০২৫ থেকে ৭ আগস্ট ২০২৭ পর্যন্ত এবং সিলোজ ইনক.-কে ৪ মার্চ ২০২৬ থেকে ৩ মার্চ ২০২৮ পর্যন্ত এইচ-১বি কর্মসূচি থেকে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া শেরউড অ্যাট মাউন্ট ডোরা ইনক., যা শেরউড একাডেমি নামে ব্যবসা করে, ২৬ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৮ পর্যন্ত এবং দা ভিঞ্চি অ্যাট হান্টার্স ক্রিক ইনক., যা দা ভিঞ্চি একাডেমি নামে পরিচালিত, ৩ আগস্ট ২০২৬ থেকে ২ আগস্ট ২০২৮ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।
নিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গোয়ারাটেকের ক্ষেত্রে ছয়টি এবং রেনোটেকের ক্ষেত্রে ৩৪টি এইচ-১বি আবেদন সংশ্লিষ্ট তথ্য সরকারি নথিতে পাওয়া যায়। সিলোজের ক্ষেত্রে চারটি এইচ-১বি আবেদন ছিল। সর্বশেষ দুই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকারি তথ্য থেকে সংশ্লিষ্ট এইচ-১বি আবেদনের সংখ্যা স্পষ্ট নয়।
তবে এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে নিষিদ্ধ তালিকায় থাকলেও শ্রম বিভাগের আলাদা ‘উইলফুল ভায়োলেটর’ বা গুরুতর নিয়মভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা অনেক বড়। সেখানে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এর মধ্যে গোয়ারাটেক, রেনোটেক, সিলোজ, শেরউড একাডেমি এবং দা ভিঞ্চি একাডেমিও রয়েছে। অন্যদিকে সব ‘উইলফুল ভায়োলেটর’ প্রতিষ্ঠান একই সময়ে সক্রিয়ভাবে এইচ-১বি কর্মসূচি থেকে নিষিদ্ধ থাকে না। দুটি তালিকা তাই এক নয়।
এই নিষেধাজ্ঞার অর্থ কী
এইচ-১বি কর্মসূচি থেকে কোনো নিয়োগকর্তাকে নিষিদ্ধ করা হলে সেটি সাধারণভাবে ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব বিদেশি কর্মীর ভিসা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দেয় না। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদ্যমান এইচ-১বি কর্মীদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। তবে নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় নিয়োগকর্তা নতুন এইচ-১বি অনুমোদন নিতে পারে না এবং অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান কর্মীর ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা স্থায়ী বসবাসের জন্য গ্রিন কার্ডের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিতে পারে না।
ফলে দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন পরিকল্পনা করা বিদেশি কর্মীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কোনো কর্মীর বর্তমান অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি চলে এলে তাকে অন্য যোগ্য নিয়োগকর্তার কাছে যাওয়ার পথ খুঁজতে হতে পারে। তবে কোনো নিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন বলেই সংশ্লিষ্ট কর্মীকে সঙ্গে সঙ্গে চাকরি ছাড়তে হবে বা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে, এমন নিয়ম নেই।
শ্রম বিভাগের বিধিতে গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার ওপর জরিমানা, বকেয়া মজুরি পরিশোধ এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অভিবাসন কর্মসূচি থেকে নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। লঙ্ঘনের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ সাধারণত এক থেকে দুই বছর হতে পারে, আর কিছু গুরুতর ক্ষেত্রে তা তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে।
কেন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়
এইচ-১বি কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট দক্ষতার বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের সুযোগ দেওয়া। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী বিদেশি কর্মী নিয়োগের কারণে একই ধরনের কাজে থাকা মার্কিন কর্মীদের মজুরি ও কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ঠেকানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
শ্রম বিভাগ বলছে, এইচ-১বি নিয়োগদাতাদের সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট পেশায় প্রচলিত মজুরি বা নিজেদের একই ধরনের কর্মীদের দেওয়া প্রকৃত মজুরি, যেটি বেশি, সেটি দিতে হয়। বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে একই ধরনের মার্কিন কর্মীদের মজুরি ও কর্মপরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়া উচিত নয়।
গুরুতর নিয়মভঙ্গের ক্ষেত্রে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শ্রম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ধরনের ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘনের জন্য প্রতি ঘটনায় সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা এবং তিন বছর পর্যন্ত সব অভিবাসন কর্মসূচি থেকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
মার্কিন কর্মীদের চাকরি কি বাড়ে
এইচ-১বি কর্মসূচি থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট পদগুলো শেষ পর্যন্ত মার্কিন নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত হয় কি না, সেটি নিয়ে পরিষ্কার সরকারি তথ্য নেই। কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে না পারলে স্থানীয় কর্মী নিয়োগ করতে পারে, আবার কাজের ধরন পরিবর্তন, অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করানো, বিদেশে কাজ সরিয়ে নেওয়া বা প্রতিষ্ঠানের অন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করার পথও বেছে নিতে পারে।
ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের এইচ-১বি সুবিধা বন্ধ হলেই একই সংখ্যক চাকরি মার্কিন কর্মীদের কাছে চলে যাবে, এমন সরল সমীকরণ করা যায় না।
এই বিষয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। কির্ক ডোরান, আলেকজান্ডার গেলবার ও অ্যাডাম আইসেনের গবেষণায় এইচ-১বি কর্মী নিয়োগের কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অন্য কর্মীদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। তবে গবেষকেরা এটিও দেখেছেন যে এই প্রভাব প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের ধরনভেদে ভিন্ন হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরোর সঙ্গে যুক্ত গবেষণায় ২০০৭ সালের এইচ-১বি লটারির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশি এইচ-১বি কর্মী পাওয়ার সুযোগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ, ব্যবসার আকার ও টিকে থাকার হার বেড়েছিল। গবেষণাটিতে সামগ্রিকভাবে একই প্রতিষ্ঠানে জন্মসূত্রে মার্কিন কলেজশিক্ষিত কর্মীদের সরাসরি স্থানচ্যুত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ছোট, দক্ষতানির্ভর এবং উচ্চ উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রভাব আরও বেশি ছিল।
শুরু ও নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রেও গবেষণার ফল একমুখী নয়। ২০২১ সালে ‘ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, এইচ-১বি লটারিতে বেশি কর্মী পাওয়ার সুযোগ পাওয়া স্টার্টআপগুলো বেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংগ্রহ, বেশি পেটেন্ট এবং অধিগ্রহণ বা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার মতো সফলতার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল।
মজুরি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে
এইচ-১বি কর্মসূচিকে ঘিরে আরেকটি বড় বিতর্ক হলো বিদেশি কর্মীদের মজুরি। ২০২৬ সালে অর্থনীতিবিদ জর্জ বোরহাসের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, শিক্ষা, পেশা, বয়স ও অবস্থানের মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে এইচ-১বি কর্মীরা তুলনামূলক মার্কিন কর্মীদের চেয়ে কম আয় করেন। গবেষণায় গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ মজুরি ব্যবধানের হিসাব পাওয়া গেছে।
তবে এই ফলকে পুরো এইচ-১বি কর্মসূচির চিত্র হিসেবে দেখা উচিত নয়। সমর্থকেরা বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান এমন বিশেষায়িত দক্ষতার কর্মী খুঁজে পায় না, যাদের জন্য এইচ-১বি ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। শ্রম বিভাগের নিয়মেও নিয়োগকর্তাদের বিদেশি কর্মীদের জন্য নির্ধারিত মজুরি ও কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত শ্রম বিভাগের সরকারি তালিকায় সক্রিয়ভাবে এইচ-১বি কর্মসূচি থেকে নিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পাঁচ। সংখ্যাটি পুরো এইচ-১বি কর্মসূচির তুলনায় খুবই ছোট হলেও, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সেখানে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব কর্মীর দীর্ঘমেয়াদি যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পরিকল্পনা নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা নিষিদ্ধ হলে ভবিষ্যৎ ভিসা নবায়ন বা গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। একই সময়ে, নিষেধাজ্ঞার কারণে ওই পদগুলো শেষ পর্যন্ত মার্কিন কর্মীদের হাতে যাচ্ছে কি না, তা পরিমাপ করার মতো পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য এখনো নেই।
এই কারণেই এইচ-১বি কর্মসূচি থেকে নিয়োগকর্তাকে নিষিদ্ধ করার নীতির প্রভাব শুধু কতটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হলো, তা দিয়ে বিচার করা কঠিন। এর প্রভাব বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পরবর্তী কর্মসংস্থান, নতুন ভিসা গ্রহণ, গ্রিন কার্ডের আবেদন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ নীতির পরিবর্তনও দেখতে হবে।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ, নিউজউইক, যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরো ও ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ।