বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সোনা সরিয়ে নিচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো, কারণ কী?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম
বিজ্ঞাপন
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সপ্তাহে নিশ্চিত করেছে, তারা উত্তর আমেরিকা থেকে নিজেদের কয়েক টন সোনা সরিয়ে নিয়েছে। ব্যাংকটি বলেছে, এই স্থানান্তরের ফলে তারা ‘গুরুতর সংকটের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত’ থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত মোট প্রায় ৩১৩ টন সোনার মধ্যে ৮৬ টন ‘ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে’ লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, এর ফলে মূল্যবান এই ধাতু ‘সংকটময় পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য সহজলভ্য’ থাকবে।
এরপর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে– ডাচরা কেন এমন করছে? তারা কি সামনে কোনো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কা করছে?
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, তা নয়। তবে এই পদক্ষেপ স্পষ্টভাবেই এমন এক বিশ্বের প্রতিক্রিয়া, যা বর্তমানে অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। বাণিজ্য ও সামরিক সংঘাত দেশগুলোকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে এবং তাদের সোনা নিজ দেশের কাছাকাছি রাখতে উৎসাহিত করছে।
এ বছরের শুরুতে ফ্রান্স ঘোষণা দেয়, তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের সোনার রিজার্ভ দেশে ফিরিয়ে এনেছে।
এদিকে, জার্মানির বুন্দেসব্যাংক ২০১৬ সালের মধ্যে বিদেশি সংরক্ষণাগার থেকে ২১৬ টনের বেশি সোনা স্থানান্তর করে, এর মধ্যে ১১১ টন নিউইয়র্ক থেকে এবং ১০৫ টন প্যারিস থেকে সরানো হয়।
বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার সময়ে এর আগেও এমন কৌশল দেখা গেছে।
‘স্নায়ুযুদ্ধের সময় কিছু ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সোনার একটি অংশ নিউইয়র্কে স্থানান্তর করেছিল,’ বলেন গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা বিশ্লেষক লিনা থমাস ও ডান স্ট্রুইভেন।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ কাভাতোনি জানান, যুদ্ধ এবং বাণিজ্যগত উত্তেজনা এই সিদ্ধান্তগুলোর কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। তবে তা নেপথ্যে থাকা কারণগুলোর তালিকার শীর্ষে নয়।
মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং দ্রুত লেনদেন করা যায় এমন স্থানে সোনা রাখা, এসব বিষয়ও ভূমিকা রেখেছে।
কাভাতোনি বলেন, আমি মনে করি না যে কোনো আসন্ন বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। আমার মনে হয়, মানুষ এখন তাদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, কীভাবে তা বাড়াতে হবে এবং কীভাবে সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আরও ভালোভাবে অবগত হচ্ছে।
দে নেদারল্যান্ডসে ব্যাংক জানিয়েছে, এ বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সরিয়ে আনা সোনা এখন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে সংরক্ষিত রয়েছে।
ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওলাফ স্লেইপেন বলেন, আমরা আশা করি কখনও এগুলো ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না, তবে আমাদের স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি শক্তিশালী করতে হবে।
বিশ্বের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর একটি হওয়ায় লন্ডনকে সেরা বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছে।
কোনো সংকটের সময় যদি দ্রুত সোনা কেনাবেচা করতে হয়, তাহলে লন্ডনই সবচেয়ে উপযোগী স্থান। এ কারণেই ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সোনা সংরক্ষণের জন্য জনপ্রিয় একটি কেন্দ্র।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বিশ্বে সোনা গচ্ছিত রাখা সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। মধ্য লন্ডনের এই ৩০০ বছর পুরোনো প্রতিষ্ঠানের নিচে চার লাখের মতো সোনার বার সংরক্ষিত রয়েছে, যার মূল্য ২০০ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের শিল্পখাতভিত্তিক জরিপ অনুযায়ী, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় ভল্টিং কেন্দ্র। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রমেই মূল্যবান এই ধাতু কোথায় সংরক্ষণ করবে, সে ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনছে।
গোল্ডম্যান স্যাকস-এর থমাস ও স্ট্রুইভেনের মতে, কোনো দেশের সোনা কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, তা এখন ‘রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের ভাবনার কেন্দ্রে ক্রমশ চলে আসছে’।
আধুনিক বিশ্বে সম্পদ স্থানান্তরের বহু উপায় রয়েছে।
ডাচরা নিউইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন সোনা বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ নতুন মজুত কিনেছে। ফলে ওই পরিমাণ সোনা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পরিবহন করার প্রয়োজন পড়েনি।
তবে ২৭ টনের বেশি সোনা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসের জাইস্ট শহরে ‘বাহ্যিকভাবে স্থানান্তর’ করা হয়েছে।
একই পরিমাণ সোনা জাইস্ট থেকে লন্ডনেও পাঠানো হয়েছে।
এ ধরনের কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে অভিযান পরিচালনা করে, সে বিষয়ে সাধারণত মুখ খোলে না। তবে বাস্তব জীবনের ঝুঁকি এড়াতে নিরাপত্তা ও পরিকল্পনার মাত্রা যে ব্যাপক, তা বলাই যায়।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের কাভাতোনি বলেন, সোনা স্থানান্তরের একটি প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে এক জায়গায় বিক্রি করে অন্য জায়গায় কেনা।
তিনি বলেন, ধরা যাক, আমি চাই আমার সোনা নিউইয়র্কে থাকুক, কিন্তু সেটি লন্ডনে রয়েছে। আমি লন্ডনে তা বিক্রি করতে পারি, একই দিনে একই সময়ে নিউইয়র্কে কিনতে পারি। কার্যত এটি একটি হিসাবভিত্তিক স্থানান্তর, যেখানে অন্য কোনো লজিস্টিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না।
সীমান্ত পেরিয়ে সোনা পরিবহনের কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠান খুব বেশি নেই। এর মধ্যে একটি হলো ব্রিংক’স গ্লোবাস সার্ভিসেস। প্রতিষ্ঠানটি বিবিসিকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ‘চাহিদা বৃদ্ধি’ লক্ষ্য করেছে।
ব্রিংক’স-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নাদের আন্তার বলেন, ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি, পাশাপাশি কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে সোনার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, এই প্রবণতায় অবদান রাখছে বলে মনে হচ্ছে।
বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনা সংরক্ষণ নিয়ে এত আলোচনা হওয়ার কারণ হলো তারা ক্রমেই বেশি সোনা কিনছে।
তবে গোল্ডম্যান স্যাকস-এর থমাস ও স্ট্রুইভেন বলেন, দেশে সোনা সংরক্ষণ করতে খরচ হয়।
তারা বলেন, দেশীয় সংরক্ষণের জন্য শারীরিক নিরাপত্তা, নিরীক্ষা অবকাঠামো এবং বীমায় বিনিয়োগ করতে হয়। ছোট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য এসব খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে এক হাজার টন সোনা সংগ্রহ করেছে। এর আগের দশকে এই গড় ছিল ৫০০ টন।
এই প্রবণতার শিকড় বৈশ্বিক আর্থিক সংকট পর্যন্ত বিস্তৃত এবং আগামী বছর এই পরিমাণ আরও বাড়বে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা