বিজ্ঞাপন
মার্কিন প্লাজমার ওপর চীনের নির্ভরতা কেন এত বেশি?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ প্লাজমা সরবরাহ করে। আর এই সরবরাহের ওপর বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি নির্ভরশীল চীন। দেশটির লাখো রোগীর জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসায় ব্যবহৃত মানব অ্যালবুমিনের বড় অংশই আসে যুক্তরাষ্ট্রে সংগৃহীত প্লাজমা থেকে।
চীনের হেনান প্রদেশের বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী গে লানের মা পাকস্থলীর ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হচ্ছেন। রক্তে প্রোটিনের মাত্রা ঠিক রাখতে তাকে প্রতিদিন মানব অ্যালবুমিন দিতে হচ্ছে। ১০ গ্রাম অ্যালবুমিনের একটি বোতলের দাম প্রায় ৪৬ ডলার।
দুই মাসে তার মায়ের প্রয়োজন হয়েছে ৭২ বোতল অ্যালবুমিন। এর পেছনে যে অর্থ খরচ হয়েছে, তা গে লানের প্রায় সাত মাসের আয়ের সমান। বোনের সহায়তা না পেলে এই চিকিৎসার খরচ বহন করা তার পক্ষে সম্ভব হতো না।
মানব অ্যালবুমিন হলো প্লাজমার সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা প্রোটিন। গুরুতর পোড়া বা আঘাতের রোগী এবং লিভারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে রক্তে প্রোটিনের মাত্রা ঠিক রাখতে এটি ব্যবহার করা হয়। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব অ্যালবুমিন ব্যবহারকারী দেশ।
কিন্তু দেশটির নিজস্ব প্লাজমা সংগ্রহ দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদার তুলনায় কম। এর পেছনে রয়েছে প্লাজমা সংগ্রহের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ। ১৯৯০-এর দশকে রক্ত ও প্লাজমা সংগ্রহের ভয়াবহ কেলেঙ্কারির পর এসব নিয়ম আরও কঠোর করা হয়।
ফলে চীনকে তার মানব অ্যালবুমিনের বড় অংশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, চীনের অ্যালবুমিন বাজারের ৬০ শতাংশের বেশি বিদেশি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে। এসব পণ্যের সব প্লাজমাই যুক্তরাষ্ট্রে সংগৃহীত।
১৯৯০-এর দশকের ভয়াবহ কেলেঙ্কারি
চীনের প্লাজমা সংকটের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৯০-এর দশকের একটি ভয়াবহ ঘটনা। ওই সময় দরিদ্র হেনান প্রদেশে অর্থের বিনিময়ে প্লাজমা বিক্রির প্রবণতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
গ্রামগুলোতে মানুষকে প্লাজমা বিক্রিতে উৎসাহিত করা হতো। অনেক দরিদ্র কৃষকের জন্য ৫০ ইউয়ান ছিল প্রায় এক মাসের আয়ের সমান।
কিন্তু প্লাজমা সংগ্রহের সময় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, একই সুচ পুনরায় ব্যবহারসহ নানা অনিয়মের কারণে ভয়াবহ এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯৫ সালে হেনানে প্রথম এইচআইভি শনাক্ত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ প্রদেশটির বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংক বন্ধ করে দেয়।
২০০৪ সালে হেনানের কর্মকর্তারা জানান, প্রদেশটির ২৫ হাজার সাবেক প্লাজমা বিক্রেতা এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে স্বাধীন গবেষকদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
এই ঘটনা চীনের রক্তজাত পণ্যের পুরো ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে। প্লাজমা সংগ্রহ থেকে শুরু করে চিকিৎসায় ব্যবহার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে প্লাজমা দানের বিষয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভীতিও তৈরি হয়।
করোনার সময় আবারও সংকট
কোভিড-১৯ মহামারির সময় চীনে মানব অ্যালবুমিন ও অন্যান্য প্লাজমাভিত্তিক ওষুধের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। গুরুতর কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় এসব ওষুধ ব্যবহারের কারণে বাজারে সংকট দেখা দেয়।
চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় শুরু হয় আতঙ্কে ওষুধ কেনার প্রবণতা। এতে দাম বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এর পর থেকেই চীনে রক্তজাত ওষুধ উৎপাদনে স্বনির্ভর হওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
২০২৩ সালে চীন ৩২টি নতুন প্লাজমা সংগ্রহকেন্দ্র চালু করে। এতে দেশটিতে অনুমোদিত কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে ৩০২টিতে দাঁড়ায়।
এর পাশাপাশি গত বছরের জুলাইয়ে চীন প্রথমবারের মতো ধান থেকে তৈরি রিকম্বিন্যান্ট মানব অ্যালবুমিন বাজারজাত করার অনুমোদন দেয়। দেশটির সরকার গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও শিল্পে বিদেশি নির্ভরতা কমানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, এটিও তার অংশ।
ওষুধটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ইয়াং দাইচাং জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এটি চীনের আমদানি করা প্লাজমা-ভিত্তিক অ্যালবুমিনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের বিকল্প হতে পারে।
তবে শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধানভিত্তিক অ্যালবুমিনের ব্যবহার সীমিত হতে পারে। কারণ এটি বর্তমানে শুধু লিভার সিরোসিসের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যায় এবং এর উৎপাদন খরচও তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে কেন মানুষ প্লাজমা বিক্রি করেন?
চীনের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে প্লাজমা সংগ্রহের ব্যবস্থা দ্রুত বাড়ছে। দেশটিতে প্লাজমা দাতাদের অর্থ দেওয়া হয়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে অনেক নিম্নআয়ের মানুষ নিয়মিত প্লাজমা বিক্রি করেন।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিটার জাওরস্কির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্লাজমা সংগ্রহকেন্দ্রের সংখ্যা ২০১৬ সালের ৬০১টি থেকে গত বছর ১ হাজার ২০০-এর বেশি হয়েছে।
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৩ কোটি ৫০ লাখ লিটারের বেশি প্লাজমা সংগ্রহ করা হয়েছিল। গত বছর সেই পরিমাণ আনুমানিক ৬ কোটি ২৫ লাখ লিটারে পৌঁছেছে।
২৫ বছর বয়সী স্কাই টাকারও নিয়মিত প্লাজমা বিক্রি করেন। তিনি সপ্তাহে দুইবার প্লাজমা দিয়েছেন প্রায় সাত বছর ধরে। তার ভাষায়, এটি কারও জীবন বাঁচাতে পারে—এ কথা তিনি জানেন। কিন্তু অনেক সময় তার কাছে নিজের পরের খাবার বা পোষা বিড়ালের খাবারের ব্যবস্থা করাই বেশি জরুরি হয়ে পড়ে।
ম্যাসাচুসেটসের ৬০ বছর বয়সী মিশেল গুডউইনও একসময় প্লাজমা বিক্রি করতেন। নার্সিং পড়াশোনার খরচ ও পরিবারের ব্যয় মেটাতে তিনি ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে সপ্তাহে দুইবার প্লাজমা দিয়ে এক বছরে ৮ হাজার ডলারের বেশি আয় করেন।
তবে সময়সাপেক্ষ ও ক্লান্তিকর হওয়ায় ২০২৪ সালে তিনি প্লাজমা দেওয়া বন্ধ করেন।
চীনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
চীনের প্লাজমা সংগ্রহের ওপর কঠোর নিয়ম এখনো বড় বাধা হয়ে আছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের হিসাবে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশটিতে সক্রিয় প্লাজমা দাতার সংখ্যা মাত্র ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ।
অন্যদিকে, চীনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জনসংখ্যার দেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্লাজমা দাতার সংখ্যা আনুমানিক ৪০ লাখ।
চীনে একজন দাতা সাধারণত দুই সপ্তাহে একবার এবং বছরে সর্বোচ্চ ২৪ বার প্লাজমা দিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে একজন দাতা সপ্তাহে দুইবার পর্যন্ত, অর্থাৎ বছরে সর্বোচ্চ ১০৪ বার প্লাজমা দিতে পারেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নৈতিক কারণে বিনা পারিশ্রমিকে প্লাজমা সংগ্রহের পক্ষে। তাদের যুক্তি, অর্থের বিনিময়ে প্লাজমা সংগ্রহ দরিদ্র মানুষের ওপর চাপ বা শোষণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে অন্যদিকে গবেষক পিটার জাওরস্কির মতে, অর্থ প্রদান করলে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরির প্রয়োজনীয় কাঁচামালের স্থায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হয়।
চীন অবশ্য নিজের প্লাজমা উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে দেশটির বর্তমান বার্ষিক প্লাজমা ঘাটতি প্রায় ৬ হাজার টন বলে শিল্পের তথ্য ও দেশীয় চাহিদার হিসাব থেকে অনুমান করা হয়েছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে কিংবা নতুন কোনো বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিলে প্লাজমা সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে চীনে মানব অ্যালবুমিনের ঘাটতি ও দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন লাখো রোগী।
চীন যতদিন না নিজস্ব প্লাজমার ঘাটতি পূরণ করতে পারছে, ততদিন গে লানের মায়ের মতো রোগীদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের দান করা প্লাজমার ওপর।
এ কারণে বিশেষজ্ঞদের সামনে বড় প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কারণে প্লাজমা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে চীন তখন প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ কোথা থেকে পাবে?
সূত্র: সিএনএন
এমএসএম