Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

প্রেমের টানে সীমান্ত পাড়ি, ২ বছর ধরে কারাগারে বাদল

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম

প্রেমের টানে সীমান্ত পাড়ি, ২ বছর ধরে কারাগারে বাদল

বিজ্ঞাপন

রাত তখন প্রায় ১টা। ভারতের আত্তারি-ওয়াঘা সীমান্তের কাছে দাঁড়িয়ে ১৯ বছরের এক তরুণ। সঙ্গে কোনো ব্যাগ নেই। নেই পাসপোর্ট, ভিসা বা টিকিট। শুধু সঙ্গে ছিল এক তরুণীর প্রতি অগাধ ভালোবাসা।

নিরাপত্তাব্যবস্থা বোঝার জন্য একে একে জুতো ছুড়ে দিয়েছিলেন অন্ধকারের দিকে। কোনো বিস্ফোরণ বা সতর্কসংকেত না পেয়ে বৈদ্যুতিক তারের নিচ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে যান তিনি।

এভাবেই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের এক রাতে পাকিস্তানে ঢুকে পড়েন ভারতের উত্তর প্রদেশের আলিগড়ের বাদল বাবু। তার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের ম্যান্ডি বাহাউদ্দিনে থাকা ফেসবুকের পরিচিত এক তরুণীর কাছে যাওয়া।

কিন্তু সেই প্রেমের পরিণতি হয়নি। বরং সীমান্ত পেরোনোর পর থেকে কারাগারেই কেটে যাচ্ছে তার জীবন।

ফেসবুকের প্রেম থেকে পাকিস্তানযাত্রা

২০২২ সালে ফেসবুকে পরিচয় হয় বাদল ও পাকিস্তানি তরুণী সানা রানির। তখন বাদলের বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর।

প্রথমে ফেসবুকে কথা বলা। পরে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ। টেক্সট থেকে অডিও কল, এরপর ভিডিও কল। ধীরে ধীরে গভীর হয় সম্পর্ক।

বাদলের পরিবার অবশ্য এসবের কিছুই জানত না। আলিগড়ের নাগলা খিতকারি গ্রামের এই তরুণ তখন দিল্লিতে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।

মাসে প্রায় ১৫ হাজার রুপি আয় করতেন। এর মধ্যে বাড়িতে পাঠাতেন ১০ হাজার রুপি। পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের বড় অংশই ছিল তার ওপর।

২০২৪ সালে সানা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। বাদল সঙ্গে সঙ্গে তাতে রাজি হয়ে যান। কিন্তু সানার পরিবার এই বিয়েতে রাজি ছিল না। বিশেষ করে, বাদল ভারতীয় নাগরিক এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় তাকে নিয়ে সানার মায়ের আপত্তি ছিল।

সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে

২০২৪ সালের আগস্টে রাখিবন্ধন উৎসবের পর বাদল তার মাকে জানান, কাজের জন্য তাকে দিল্লিতে ফিরতে হবে। সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ স্বাভাবিক দেখা।

এরপর তিনি বাড়ি ছেড়ে যান। নিজের পোশাক, টাকা-পয়সা ও সরকারি পরিচয়পত্রও বাড়িতেই রেখে যান। কয়েক সপ্তাহ পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না।

দীপাবলির একদিন আগে অবশ্য একটি ভিডিও কল আসে। কলটি অন্য একটি নম্বর থেকে।

বাদলের মা গায়ত্রী পরে বুঝতে পারেন, নম্বরটির শুরুতে ছিল পাকিস্তানের কান্ট্রি কোড +৯২। তখনও পরিবার বুঝতে পারেনি, বাদল কোথায়।

ফিরিয়ে দিলেন প্রেমিকা

পাকিস্তানে পৌঁছে বাদল ম্যান্ডি বাহাউদ্দিন এলাকায় সানা রানির সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু সানা তাকে বিয়ে করতে রাজি হননি। সানার মা-ও এই বিয়ের বিরোধিতা করেন।

এদিকে বাদলের কাছে কোনো পরিচয়পত্র না থাকায় বৈধ পথে ভারতে ফেরাও সম্ভব ছিল না। তাই পাকিস্তানের একটি গ্রামে তিনি গবাদিপশু চরানোর কাজ শুরু করেন।

স্থানীয় একটি পরিবার তাকে থাকতে দেয়। কয়েকমাস এভাবেই থাকার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

কিন্তু ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর তার কথাবার্তায় ধরা পড়ে আলিগড়ের স্থানীয় উপভাষার টান। স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হয়।

জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বাদল স্বীকার করেন, তিনি ভারতের নাগরিক। এরপর স্থানীয় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

কারাগারে বাদল

২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সদর ম্যান্ডি বাহাউদ্দিন থানায় বাদলকে গ্রেফতার দেখানো হয়। তার বিরুদ্ধে ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৩ ও ১৪ ধারায় মামলা হয়।

২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সঙ্গে পাঁচ হাজার পাকিস্তানি রুপি জরিমানাও করা হয়।

বাদলের আইনজীবী ফিয়াজ রামে বলেছেন, তার বিরুদ্ধে ভারতের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কোনো কর্মকাণ্ডের প্রমাণ নেই। তার একমাত্র অভিযোগ হলো, তিনি বৈধ ভিসা বা অনুমতি ছাড়া পাকিস্তানে প্রবেশ করেছেন।

আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই বাদলের সাজা শেষ হয়েছে। এরপরও তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরতে পারেননি।

দেশে ফেরার অপেক্ষায় পরিবার

বাদলের বাবা কৃপাল সিংহ ছেলের ফেরার আশায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরছেন। আইনি প্রক্রিয়ায় পরিবারের প্রায় তিন লাখ রুপি খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তার কথায়, এখন পরিবারের আশা সরকারের হস্তক্ষেপের ওপর।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি থেকেও জানা গেছে, পাকিস্তানের লাহোর কারাগারে বাদলের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদের কনস্যুলার যোগাযোগ হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি তাকে কনস্যুলার অ্যাকসেস দেওয়া হয়।

তবে তার ভারতীয় নাগরিকত্বের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ তখনও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাকিস্তানের কারাগারে থাকা ভারতীয় বন্দিদের মুক্তি ও দেশে ফেরানোর বিষয়টি নিয়মিত কূটনৈতিক পর্যায়ে তোলা হয়। বাদলের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

সূত্র: দ্য প্রিন্ট

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার