Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

তুরস্কের দিকে চোখ রাঙাচ্ছে ইসরায়েল, যুদ্ধ কি সত্যিই আসছে?

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪১ এএম

তুরস্কের দিকে চোখ রাঙাচ্ছে ইসরায়েল, যুদ্ধ কি সত্যিই আসছে?

বিজ্ঞাপন

তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন বেশ উত্তপ্ত। অথচ একসময় তারা ছিল যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ। তুরস্ক ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি। ১৯৪৯ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকে তুরস্ক-ইসরায়েল সামরিক সহযোগিতা দ্রুত বাড়ে। যৌথ সামরিক মহড়া, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং অস্ত্র আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৯৯৬ সালে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা নতুন মাত্রা পায়। ইসরায়েল তুরস্কের যুদ্ধবিমান আধুনিকায়নেও ভূমিকা রাখে।

কিন্তু গাজা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে সম্পর্ক ধীরে ধীরে বদলে যায়। ২০০৮-০৯ সালের গাজা যুদ্ধের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নেন।

২০১০ সালের মাভি মারমারা ঘটনাও সম্পর্কের বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গাজায় ত্রাণ নিয়ে যাওয়া ওই জাহাজে ইসরায়েলি অভিযানে তুরস্কের নাগরিকসহ কয়েকজন নিহত হন। এরপর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে অবনতি হয়।

তবে রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলেও বাণিজ্য অনেকদিন চলেছে।

বাণিজ্যে ছিল বড় নির্ভরতা

ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ একসময় কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। ২০২৩ সালে দুই দেশের মোট বাণিজ্য ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।

তুরস্ক থেকে ইসরায়েলে যেত ইস্পাত, সিমেন্ট, নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিক, যানবাহন ও বিভিন্ন শিল্পপণ্য।

২০২৩ সালে তুরস্ক থেকে ইসরায়েলের সরাসরি আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তৃতীয় দেশের মাধ্যমে যাওয়া তুরস্কে উৎপাদিত পণ্য ধরলে পরিমাণ আরও বাড়ে।

অর্থাৎ রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কিন্তু গাজা যুদ্ধ সেই হিসাব পাল্টে দেয়।

রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান/ ছবি: ফেসবুক

গাজা যুদ্ধের পর বাণিজ্য বন্ধ

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হলে এরদোয়ান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমেই কঠোর অবস্থান নিতে থাকেন।

২০২৪ সালে তুরস্ক প্রথমে কিছু পণ্যে বিধিনিষেধ দেয়। পরে ২ মে ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয়।

আঙ্কারার বক্তব্য ছিল, গাজায় পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।

এর ফলে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কার্যত ভেঙে পড়ে।

ইসরায়েলও তুরস্কের বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজতে শুরু করে। এতে দুই দেশের অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরতা কমে যায়।

সিরিয়া হয়ে উঠছে সংঘাতের নতুন কেন্দ্র

গাজা ছিল তুরস্ক ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিরোধের প্রধান বিষয়। কিন্তু এখন সিরিয়া সেই বিরোধকে সরাসরি নিরাপত্তা সংকটে পরিণত করছে।

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামো বদলে গেছে। তুরস্ক নতুন সিরীয় নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ সমর্থক।

আঙ্কারা সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। প্রশিক্ষণ, সামরিক অবকাঠামো এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় তুরস্কের ভূমিকা বাড়ছে।

অন্যদিকে ইসরায়েল সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক প্রভাবকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছে।

এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় উদাহরণ গত ১৮ আগস্টের ঘটনা। ইসরায়েল সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। ইসরায়েলের দাবি, সেখানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছিল।

তুরস্ক এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সিরিয়াও বলেছে, ওই ঘাঁটিতে স্থায়ী তুর্কি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল না।

তবু হামলাটি একটি বড় বার্তা দিয়েছে। ইসরায়েল এখন সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক প্রভাবকে সরাসরি নজরে রাখছে।

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু/ ছবি: ফেসবুক

নেতানিয়াহুর কড়া হুঁশিয়ারি

সিরিয়ায় হামলার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তুরস্ককে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি দক্ষিণ দিকে বাড়তে দেওয়া হবে না।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও এরদোয়ানকে সতর্ক করেছেন। ইসরায়েলের বক্তব্যের মূল কথা হলো, সিরিয়ায় তুরস্ক এমন কোনো সামরিক কাঠামো তৈরি করতে পারবে না, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

তুরস্কের দৃষ্টিতে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আঙ্কারা মনে করে, সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের মধ্যে থেকে নতুন সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা করা তার বৈধ অধিকার।

এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা না হলে সিরিয়া আরও বড় সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নতুন পরোয়ানা

এর মধ্যেই তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের বিরোধ আরও এক ধাপ বেড়েছে।

২১ আগস্ট তুরস্ক ঘোষণা দেয়, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

তুরস্কের বিচারমন্ত্রী আকিন গুরলেক জানান, গাজামুখী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি অভিযানের ঘটনায় করা একটি মামলায় নেতানিয়াহু ও আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।

অভিযোগের মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ। তবে ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ নিজে কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা নয়। এটি কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত ও সাময়িকভাবে আটক করার জন্য সদস্য দেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অনুরোধ মাত্র।

তবু রাজনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব অনেক। কারণ একটি ন্যাটো সদস্য দেশ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে।

তুরস্ক-ইসরায়েল কি যুদ্ধে জড়াবে?

এই মুহূর্তে এটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা এখনো কম। কিন্তু সীমিত সংঘর্ষের ঝুঁকি বেড়েছে, বিশেষ করে সিরিয়ায়।

দুই দেশের সামরিক বাহিনী যদি একই এলাকায় সক্রিয় থাকে, তাহলে ভুল বোঝাবুঝি থেকে সংঘর্ষ হতে পারে।

ধরা যাক, কোনো ইসরায়েলি হামলায় তুরস্কের সেনা বা সামরিক উপদেষ্টা নিহত হলেন। তখন আঙ্কারার ওপর পাল্টা জবাব দেওয়ার রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে।

আবার তুরস্কের কোনো হামলায় ইসরায়েলি সেনা বা যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইসরায়েলও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

এভাবে একটি সীমিত ঘটনা বড় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

এই ঝুঁকি কমাতেই তুরস্ক, ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে সামরিক যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

দৌসি-পাকিস্তান-তুরস্কের নতুন সামরিক জোট/ ছবি: আনাদোলু এজেন্সি

সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে তুরস্ক

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের কথা মাথায় রেখে তুরস্ক সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে—এমন ধারণা জোরালো হয়েছে।

তুরস্ক গত এক দশকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা তৈরি করছে দেশটি।

বিশেষ করে ড্রোন শিল্প তুরস্ককে আলাদা সুবিধা দিয়েছে। নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর ফলে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমেছে।

স্টিল ডোম কেন গুরুত্বপূর্ণ

তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম বড় প্রকল্প ‘স্টিল ডোম’। এটি কোনো একক ক্ষেপণাস্ত্র নয়। বরং রাডার, কমান্ড ও কন্ট্রোল, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাকে একটি সমন্বিত কাঠামোয় আনার উদ্যোগ।

ইসরায়েলের বড় সামরিক শক্তির একটি হলো যুদ্ধবিমান ও দূরপাল্লার আঘাতের সক্ষমতা। তাই তুরস্কের জন্য শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তুরস্কের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প শক্তিশালী হলে সম্ভাব্য যুদ্ধে দেশটির কৌশলগত স্বাধীনতাও বাড়বে।

আঞ্চলিক জোটও শক্তিশালী করছে আঙ্কারা

সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি তুরস্ক আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতাও বাড়াচ্ছে। আগস্টে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে।

চুক্তিটিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ একটি পক্ষের ওপর আক্রমণকে অন্য অংশীদারদের জন্যও হুমকি হিসেবে দেখার নীতি রয়েছে এতে।

তবে এটি সরাসরি ইসরায়েলবিরোধী সামরিক জোট নয়। তবু আঞ্চলিক শক্তির সমন্বয় হিসেবে এর গুরুত্ব রয়েছে। ভবিষ্যতে মিশরসহ আরও কিছু দেশ এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।

এরদোয়ানের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার।

কী করবেন এরদোয়ান?

এরদোয়ানের সামনে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি করা।

তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনি চাপ অব্যাহত রাখতে পারেন। গাজা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় থাকতে পারেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ এগিয়ে নিতে পারেন। আবার, সিরিয়ায় নতুন সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাও বজায় রাখতে পারেন।

একই সঙ্গে, তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াতে পারেন এরদোয়ান। এর সঙ্গে সৌদি আরব, পাকিস্তান, কাতার ও মিশরের মতো দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করা যেতে পারে।

অর্থাৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়, যুদ্ধ ঠেকানোর মতো শক্তি তৈরি করাই হতে পারে এরদোয়ানের প্রধান কৌশল।

সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, অ্যাক্সিওস

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার