Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

লন্ডনের বিলাসী শহরে আরবদের আয়েশি জীবন

Icon

লন্ডন প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৩ এএম

লন্ডনের বিলাসী শহরে আরবদের আয়েশি জীবন

বিজ্ঞাপন

লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে ঘড়ির কাঁটায় মাত্র সকাল দশটা। অথচ গ্রীষ্মের দাবদাহে শহরের তাপমাত্রা ইতিমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বলা হচ্ছে, এটিই হতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের উষ্ণতম গ্রীষ্মকাল। অক্সফোর্ড স্ট্রিটের বিখ্যাত সেলফ্রিজেস ডিপার্টমেন্ট স্টোরের বাইরে যখন রোদ চুঁইয়ে পড়ছে রাজপথে, এক গৃহহীন মানুষ তখন দুটি মুদ্রার জন্য হাত পাতছেন, আর পাশে পড়ে থাকা এক পরিত্যক্ত দৈনিক খবরের কাগজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দাবানলের ভয়াবহতার নতুন খবর ছাপা হচ্ছে।

তবে সেলফ্রিজের ভেতরে প্রবেশ করলেই শহরের এই রুক্ষ রূপ উধাও। সেখানে কুলকুল করে চলছে আধুনিক এয়ার কন্ডিশনিং। একটি কাউন্টারে বিক্রি হচ্ছে সুবাসিত আরবি কফি, আর প্রচার চলছে সৌদি আরবের। কারণ, এই বিখ্যাত ডিপার্টমেন্ট স্টোরের প্রায় ৪০ শতাংশ মালিকানা এখন সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের হাতে। 

ঠিক গত সপ্তাহেই এই সেলফ্রিজেস থেকেই বেরিয়ে এসেছিলেন দুবাইয়ের শাসক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম। কাছাকাছি নর্থ অডলে স্ট্রিটে হাঁটার সময় সুদানের চলমান যুদ্ধ নিয়ে তাঁর দেশের ভূমিকার প্রতিবাদ জানিয়ে এক ব্যক্তি তাঁকে লক্ষ্য করে স্লোগান দিয়েছিলেন।

প্রতিবাদকারী সেই সুদানি যুবক চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন, আমিরাত আমাদের দেশে মানুষ হত্যা করছে, আমার দেশের মানুষদের হত্যা করা বন্ধ করুন। রাস্তার ওপার থেকে আসা এই প্রতিবাদের জবাবে দুবাই শাসকের বিশাল বহরের এক সদস্য এগিয়ে যান এবং ওই যুবককে উদ্দেশ্য করে বর্ণবাদী গালাগাল দেন। 

অবশ্য এরপরও মোহাম্মদ বিন রশিদ লন্ডনেই অবস্থান করছেন। সেখানে তিনি আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং ১৯৬০-এর দশকের সুইং লন্ডনের জন্য পরিচিত চেলসি এলাকায় তাকে দেখা গেছে।

তবে ধনী উপসাগরীয় নাগরিকদের জন্য লন্ডনের আসল ঠিকানা হয়ে উঠেছে মেফেয়ার। যে এলাকায় নর্থ অডলে স্ট্রিট অবস্থিত, তা বিশ্বের অন্যতম বিত্তশালী একটি অঞ্চল। দামি রেস্তোরাঁ, বিলাসবহুল গাড়ির শোরুম আর রাজকীয় সব হোটেলে পরিপূর্ণ এই মেফেয়ার। সেলফ্রিজের ভেতরেই মিডলইস্ট আইয়ের কথা হয় দুবাই থেকে আসা ১৫ বছরের কিশোর খালেদ এবং তার ৫৩ বছর বয়সী চাচা মোহাম্মদের সঙ্গে। আত্মবিশ্বাসী তরুণ খালেদ বলছিল, লন্ডনে তাদের অনেক বিনিয়োগ রয়েছে এবং তারা এখানকার অর্থনীতিকে সহায়তা করতে ভালোবাসে।

সুদান সংকট নিয়ে দুবাই শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে খালেদ মন্তব্য করে যে সুদানিরা অজ্ঞ, তারা সুদানকে মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে এবং এ ধরনের আচরণ অসম্মানজনক। তার চাচা মোহাম্মদ যোগ করেন যে প্রত্যেকের বাকস্বাধীনতা থাকতে পারে, কিন্তু কোনো নেতার সঙ্গে এভাবে কথা বলা যায় না।

তেল আবিষ্কারের আগের দুবাইয়ের কঠোর ও সরল দিনগুলোর কথা স্মরণ করে মোহাম্মদ জানান, বর্তমান আমিরাতে যেকোনো জিনিস চাইলে কয়েক মিনিটের মধ্যে হাতের কাছে পৌঁছে যায়, এমনকি কাউকে উঠে দাঁড়াতেও হয় না। প্রতি আগস্ট মাসে তিন সপ্তাহের জন্য মেফেয়ারে এসে থাকাটা তাদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে আমিরাতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং শহরজুড়ে আমিরাতের অর্থের ছড়াছড়ি তাদেরকে একটা চেনা আবহ উপহার দেয়।

খালেদ ভবিষ্যতে লন্ডনেই পড়াশোনা করতে চায়। অথচ মজার ব্যাপার হলো, দুবাইয়ের সাধারণ তাপমাত্রা লন্ডনের এই রেকর্ড গরমের চেয়েও প্রায় দশ ডিগ্রি বেশি থাকে, যেখানে জীবন মূলত এসি-নির্ভর। তা সত্ত্বেও এই কিশোর লন্ডন বলতে কেবল সেন্টারের অভিজাত এলাকাগুলোকেই বোঝে। রোডম্যান, অভিবাসী বা ছুরি নিয়ে হামলা হতে পারে; এমন কোনো বিপজ্জনক এলাকায় তারা পা বাড়ায় না। তার ফোনে মেফেয়ারের আশেপাশেই সীমাবদ্ধ কিছু পছন্দের হ্যাংআউটের তালিকা রয়েছে, যার মধ্যে সিপ্রিয়ানি, আইভি এশিয়া, সেক্সি ফিশ, সুপারনোভা এবং নোবুর মতো নামকরা রেস্তোরাঁগুলো অন্তর্ভুক্ত।

মেফেয়ারের বাইরে লন্ডনের বাকি অংশ নিয়ে এই উপসাগরীয় নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। সৌদি আরবের এক নারী জানান, তাদের পরিচিত এক কিশোর সৌদি আরব থেকে লন্ডনে একটি সামার স্কুলে পড়তে এসে প্রতিদিন হার্টস ডিপার্টমেন্ট স্টোরের দিকে ছুটে যায়, যেটির বর্তমান মালিক কাতার। ওই কিশোর স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল যে তার একজন দেহরক্ষী দরকার, কারণ এখানকার মানুষেরা এতই গরিব যে তার হারমেস ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে ছুরিকাঘাত করতে পারে। বাহরাইন থেকে আসা ১৭ ও ১৫ বছর বয়সী দুই বোন সেলফ্রিজে দাঁড়িয়ে জানায় যে তারা এখানে এসে নিজেদের পরিচিত অনেকের দেখা পেয়েছে। তাদের মতে, বাহরাইনের তুলনায় এখানকার পাতাল রেল অত্যন্ত জনবহুল ও বিশৃঙ্খল এবং এখানকার স্থাপত্যশৈলীও একেবারেই আলাদা।

অক্সফোর্ড স্ট্রিটের অপর প্রান্তে অবস্থিত মার্লবোরো পাবের বাইরে তখন দুপুরের রোদ আরও চড়া হয়েছে। চারপাশের রাস্তায় কুয়েতি ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সার সাররা ও এহলাফ একে অপরের ছবি তুলছেন, পাশ দিয়ে মুক্তার মালায় সেজে হেঁটে যাচ্ছেন এক প্রবীণ নারী, আর গর্জন করে বেরিয়ে যাচ্ছে একটি বুগাটি গাড়ি। কুয়েত থেকে মেফেয়ারে বেড়াতে আসা সাররা জানান যে তারা মূলত আবহাওয়া, মানুষ এবং কেনাকাটার টানেই এখানে আসেন।

মেফেয়ারের গ্রেজ অ্যান্টিকে মার্কেটেও একই চিত্র দেখা যায়। এখানকার এক গহনা ব্যবসায়ী জানান, আগস্ট মাস এলেই উপসাগরীয় অঞ্চলের বিত্তশালী পর্যটকরা উপচে পড়েন। সৌদি আরব, বাহরাইন এবং আমিরাতের রাজপরিবারের সদস্যরাও এই মার্কেটের নিয়মিত ক্রেতা। থাইল্যান্ডের কোনো রাজকুমারী কিংবা সাধারণ গালফ নাগরিকরা এখানে এসে কার্টিয়ার, টিফানি বা বুলগারির মতো ব্র্যান্ডের অলংকার দেদারছে কেনাকাটা করেন।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে রুশ ধনকুবেরদের পদচারণায় মেফেয়ারকে 'লন্ডনগ্রাদ' বলা হতো। তবে বর্তমান ব্যবসায়ী সমাজের মতে, রুশরা সেই ডুবন্ত জাহাজ থেকে ইঁদুরের মতো পালিয়ে গেছে এবং যারা রয়ে গেছে তাদের হাতে সেভাবে অর্থ নেই। গ্রোভসনার স্কয়ারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সাবেক বিশাল ভবনটি এখন বিলাসবহুল হোটেল ও রেস্তোরাঁয় রূপান্তরিত হয়েছে। এর মধ্যে কাতারি মালিকানাধীন কিনওয়ান ক্যাফে উপসাগরীয় পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণের জায়গা। আবায়া পরা নারী এবং পোলো শার্ট পরা পুরুষেরা কফির কাপে চুমুক দিয়ে ইনস্টাগ্রামে ছবি আপলোড করতে ব্যস্ত থাকেন।

সব মিলিয়ে লন্ডনের এই মেফেয়ার অঞ্চল যেন মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর অভিজাত সমাজের এক টুকরো নিজেদের মতো করে গড়ে তোলা নিজস্ব দুনিয়া, যেখানে পাউন্ডের হিসেব ছাড়া আর কোনো বাস্তবতার দেখা মেলে না।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার