Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

অফিস সহকারী থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি

এবার সেখানেই ওষুধ তৈরির গবেষণাগারে তিনি

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম

অফিস সহকারী থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি

বিজ্ঞাপন

পড়াশোনার খরচ চালাতে কখনো কম্পিউটারের দোকানে কাজ করেছেন, আবার সরকারি চাকরিতে ছিলেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর। সীমিত সুযোগ আর আর্থিক সংকটের মধ্যেও গবেষক হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি আশুতোষ নাথ। সেই পথ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টন থেকে অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি শেষ করেছেন তিনি। এবার ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের কলেজ অব ফার্মেসিতে পিএইচডি পরবর্তী গবেষণায় যুক্ত হয়ে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে কাজ করতে যাচ্ছেন ৩৪ বছর বয়সী এই বাংলাদেশি গবেষক।

আশুতোষের বেড়ে ওঠা খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা স্বচ্ছল ছিল না। তাঁর বাবা মিলন নাথ জীবিকার সন্ধানে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে পরিবার নিয়ে মানিকছড়িতে চলে গিয়েছিলেন। মা নিয়তী দেবীও সংসারের হাল ধরেছিলেন। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে আশুতোষ সবার ছোট। তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ তৈরিতে বড় ভাই পরিতোষ নাথের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। পোশাক সেলাই করে উপার্জনের একটি বড় অংশ ছোট ভাইয়ের পড়াশোনায় ব্যয় করতেন তিনি।

স্কুল ও কলেজ শেষ করার পর আশুতোষ ভর্তি হন চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের রসায়ন বিভাগে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনার সঙ্গে বেড়ে যায় খরচ। বই কেনা থেকে শুরু করে নিজের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। তখন চট্টগ্রামের চকবাজারের একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ শুরু করেন তিনি। সেখানকার আয় দিয়ে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও কিছু অর্থ পাঠাতেন।

স্নাতকে পড়ার সময়ই সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন আশুতোষ। ২০১৬ সালে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরি পেয়ে ঢাকায় চলে আসেন। চাকরির বেতনে সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হওয়ায় পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিংও করতেন। দিনের চাকরির পর রাত জেগে কাজ করে নিজের পড়াশোনা ও পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন সামলেছেন তিনি।

স্নাতকে রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য নতুন সুযোগ আসে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বুয়েটে রসায়নে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন আশুতোষ। ২০১৯ সালে সেখান থেকে ডিগ্রি শেষ করেন। এই সময়টিই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। নিয়মিত গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশ হতে থাকে।

বুয়েটে গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আরও দৃঢ় হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে থাকেন আশুতোষ। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে শতভাগ স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টনে পিএইচডি করার সুযোগ পান। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েট টিচিং ও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবেও কাজ করেন।

২০২৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টন থেকে কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন আশুতোষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক গ্র্যাজুয়েশন নথিতেও তাঁর পিএইচডি এবং অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে গবেষণার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল জটিল পলিহেটেরোসাইক্লিক অণু তৈরির নতুন ও কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন।

অধ্যাপক ওয়েই ঝাংয়ের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণার সময় সিনথেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রির বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। অর্গানিক সিনথেসিস, রিঅ্যাকশন অপটিমাইজেশন, এনএমআর, এলসি এমএস, এইচপিএলসি, ক্রিস্টালোগ্রাফি, ডিএফটি ক্যালকুলেশন এবং মলিকিউলার ডকিংয়ের মতো গবেষণা পদ্ধতিতে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

তাঁর গবেষণার ফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতেও জায়গা পেয়েছে। ২০২৫ সালে আশুতোষ নাথ, জন মার্ক আওয়াদ ও অধ্যাপক ওয়েই ঝাংয়ের একটি গবেষণা বেইলস্টাইন জার্নাল অব অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে প্রকাশিত হয়। ২০২৬ সালে অর্গানিক লেটারসেও তাঁর একাধিক গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। এসব গবেষণায় জটিল রাসায়নিক কাঠামো তৈরির নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।

নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও গবেষণার অভিজ্ঞতা হয়েছে আশুতোষের। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও বোস্টন চিলড্রেনস হসপিটালের গবেষকদের সঙ্গে ছোট অণু ও প্রিসিশন ভ্যাকসিন সংশ্লিষ্ট গবেষণায় সহযোগিতা করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

পিএইচডির পর এবার গবেষণার ক্ষেত্র আরও সরাসরি ওষুধ আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন আশুতোষ। চলতি আগস্টে ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের কলেজ অব ফার্মেসিতে পিএইচডি পরবর্তী গবেষক হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা তাঁর। সেখানে সিনথেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি ও ড্রাগ ডিসকভারির কাজে ব্যবহার করবেন।

নতুন গবেষণায় জৈবিকভাবে সক্রিয় ক্ষুদ্র অণুর নকশা, সংশ্লেষণ ও কার্যকারিতা বাড়ানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। ভবিষ্যতে সিনথেটিক ও মেডিসিনাল কেমিস্ট্রির সঙ্গে কম্পিউটেশনাল মডেলিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যুক্ত করে ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণা আরও এগিয়ে নিতে চান তিনি।

খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত এলাকা থেকে চট্টগ্রামের কম্পিউটার দোকান, সেখান থেকে ঢাকায় সরকারি অফিসের চাকরি, বুয়েটের গবেষণাগার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি, আশুতোষের দীর্ঘ পথচলার নতুন গন্তব্য এখন ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণা। তাঁর লক্ষ্য, এমন গবেষণায় যুক্ত হওয়া যার ফল শেষ পর্যন্ত মানুষের চিকিৎসায় নতুন ও কার্যকর ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার