বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্কে বছরে ১ লাখ ডলার আয়েও কেন বাংলাদেশীদের সঞ্চয় করা কঠিন!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্কে বছরে ১ লাখ ডলার আয় শুনতে বড় অঙ্ক মনে হলেও চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য এই অর্থে সব খরচ সামলে নিয়মিত সঞ্চয় করা কঠিন হতে পারে। বাসাভাড়া, ট্যাক্স, খাবার, হেলথ ইন্স্যুরেন্স, চাইল্ড কেয়ার ও যাতায়াতের খরচ মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন যে, ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী নিউইয়র্ক সিটির কিছু এলাকায় চার সদস্যের পরিবারের শুধু মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই বছরে ১ লাখ ডলারের বেশি আয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির লিভিং ওয়েজ ক্যালকুলেটরের ২০২৬ সালের তথ্য এই বাস্তবতার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। ম্যানহাটনে দুই প্রাপ্তবয়স্ক ও দুই সন্তানের পরিবারে একজন মাত্র কর্মজীবী হলে মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ঘণ্টায় প্রায় ৫৮ ডলার আয় প্রয়োজন বলে হিসাব করা হয়েছে। ফুলটাইম কাজের হিসাবে এটি বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলার।
একই পরিবারের দুই প্রাপ্তবয়স্কই কাজ করলে ম্যানহাটনে প্রত্যেকের ঘণ্টায় প্রায় ৪০.৬১ ডলার আয় প্রয়োজন। দুজনের সম্মিলিত বার্ষিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার ডলার। অর্থাৎ বছরে ১ লাখ ডলারের পারিবারিক আয় অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চয়ের আগেই মৌলিক ব্যয় মেটাতে চাপে পড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশি অধ্যুষিত কুইন্সেও পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। এমআইটির ২০২৬ সালের হিসাবে দুই প্রাপ্তবয়স্ক ও দুই সন্তানের পরিবারে একজন কর্মজীবী হলে ঘণ্টায় প্রায় ৫২.৮৪ ডলার আয় প্রয়োজন। বছরে এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ডলার। দুই প্রাপ্তবয়স্কই কাজ করলে প্রত্যেকের প্রয়োজনীয় আয় ঘণ্টায় প্রায় ৩৭.৬১ ডলার, অর্থাৎ পরিবারের সম্মিলিত আয় বছরে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার ডলার।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এমআইটির লিভিং ওয়েজ হিসাব কোনো বিলাসবহুল জীবনযাত্রার বাজেট নয়। খাবার, বাসস্থান, পরিবহন, চিকিৎসা, চাইল্ড কেয়ার, ট্যাক্সসহ পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে কত আয় দরকার, তার একটি আনুমানিক হিসাব এটি। ফলে বাড়ি কেনার ডাউন পেমেন্ট, বড় অঙ্কের সঞ্চয়, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা ব্যয়বহুল জীবনযাত্রা এই হিসাবের মূল লক্ষ্য নয়।
বছরে ১ লাখ ডলার বেতন মানে মাসে গ্রস ইনকাম প্রায় ৮ হাজার ৩৩৩ ডলার। কিন্তু এই পুরো অর্থ পরিবারের হাতে আসে না। ফেডারেল ইনকাম ট্যাক্সের পাশাপাশি নিউইয়র্ক স্টেট ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়। নিউইয়র্ক সিটির বাসিন্দাদের আবার আলাদা সিটি ইনকাম ট্যাক্সও রয়েছে। এর সঙ্গে সোশ্যাল সিকিউরিটি ও মেডিকেয়ার পেরোল ট্যাক্স কেটে নেওয়া হয়। পরিবারের ফাইলিং স্ট্যাটাস, সন্তান, বিভিন্ন ডিডাকশন ও ক্রেডিটের কারণে প্রত্যেকের প্রকৃত টেক হোম পে আলাদা হয়।
নিউইয়র্ক সিটির নিজস্ব ইনকাম ট্যাক্স ব্যবস্থাও পরিবারের হাতে থাকা অর্থের ওপর প্রভাব ফেলে। নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব ট্যাক্সেশন অ্যান্ড ফাইন্যান্সের প্রকাশিত হার অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সিটির ব্যক্তিগত ইনকাম ট্যাক্সের হার আয়ের স্তর ও ফাইলিং স্ট্যাটাস অনুযায়ী প্রায় ৩ শতাংশের কিছু বেশি থেকে ৩.৮৭৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
এরপর আসে হাউজিং। এমআইটির ২০২৬ সালের হিসাবে ম্যানহাটনে দুই প্রাপ্তবয়স্ক ও দুই সন্তানের পরিবারের জন্য বার্ষিক হাউজিং ব্যয় প্রায় ৪০ হাজার ৮৭৭ ডলার ধরা হয়েছে। অর্থাৎ মাসে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ ডলার। কেবল বাসস্থানের খরচই ১ লাখ ডলার গ্রস আয়ের বড় একটি অংশ নিয়ে নিতে পারে।
সন্তান ছোট হলে সবচেয়ে বড় চাপগুলোর একটি চাইল্ড কেয়ার। দুই অভিভাবকই কাজ করেন এমন দুই সন্তানের পরিবারের জন্য ম্যানহাটনে এমআইটির হিসাবে বার্ষিক চাইল্ড কেয়ার ব্যয় প্রায় ৩২ হাজার ডলার। এর সঙ্গে বছরে খাবারের জন্য প্রায় ২০ হাজার ৮০০ ডলার, চিকিৎসা ব্যয়ে প্রায় ১২ হাজার ৭০০ ডলার এবং পরিবহনে প্রায় ৭ হাজার ৯০০ ডলারের হিসাব রয়েছে।
এই কারণেই একই ১ লাখ ডলার বেতনের আর্থিক মূল্য পরিবারভেদে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। সন্তানহীন একজন সিঙ্গেল ব্যক্তির জন্য যে আয় তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যের হতে পারে, দুই সন্তানসহ একটি পরিবারের ক্ষেত্রে একই অর্থ যথেষ্ট নাও হতে পারে। আবার পরিবারের দুজন আয় করছেন কি না, চাইল্ড কেয়ার প্রয়োজন কি না, কোথায় বাসা নেওয়া হয়েছে এবং চাকরির মাধ্যমে হেলথ ইন্স্যুরেন্স কতটা কভার হচ্ছে, তার ওপর মাসিক বাজেট ব্যাপকভাবে বদলে যায়।
এমনকি নিউইয়র্কের মধ্যেও পার্থক্য বড়। ম্যানহাটন ও কুইন্সের জীবনযাত্রার ব্যয় এক নয়, আবার নিউইয়র্ক সিটির বাইরের অনেক কাউন্টিতে একই পরিবারের প্রয়োজনীয় আয় আরও কম হতে পারে। ফলে শুধু বার্ষিক বেতন দিয়ে একজন পরিবার কতটা স্বচ্ছল, তা নির্ধারণ করা কঠিন।
বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের ক্ষেত্রে আরও কিছু আলাদা আর্থিক অগ্রাধিকার থাকতে পারে। দেশে পরিবারকে অর্থ পাঠানো, সন্তানের শিক্ষা, ভবিষ্যতে বাড়ি কেনার জন্য ডাউন পেমেন্ট জমানো কিংবা আত্মীয়স্বজনের বিভিন্ন দায়িত্ব বহনের কারণে মাসিক বাজেটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এসব ব্যয় পরিবারভেদে আলাদা এবং সব বাংলাদেশি পরিবারের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে বছরে ১ লাখ ডলার আয় কম নয়, কিন্তু চার সদস্যের পরিবারের জন্য এটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চ আয়ের নিশ্চিন্ত জীবন হিসেবে দেখার সুযোগও নেই। ২০২৬ সালের লিভিং ওয়েজ হিসাব বলছে, কুইন্স বা ম্যানহাটনের মতো এলাকায় দুই সন্তানসহ একটি পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্যই পরিস্থিতিভেদে ১ লাখ ডলারের উল্লেখযোগ্য বেশি পারিবারিক আয় প্রয়োজন হতে পারে।
তাই নিউইয়র্কে ১ লাখ ডলার বেতনের আসল হিসাব শুধু পেচেকের অঙ্কে নয়। পরিবারে কয়জন সদস্য, কয়জন আয় করেন, কোথায় থাকেন, সন্তানদের চাইল্ড কেয়ার প্রয়োজন কি না এবং হাউজিং ও হেলথ কেয়ারে কত খরচ হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত সঞ্চয় থাকবে কি না সেটি নির্ধারণ করে মূলত এসব বিষয়ই।