বিজ্ঞাপন
ইরানে সামরিক নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন, ‘আক্রমণাত্মক’ কৌশলে জোর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২১ এএম
বিজ্ঞাপন
ইরান তাদের সামরিক কমান্ড কাঠামোতে ব্যাপক রদবদল আনছে এবং দেশের ভেতরে-বাইরে শত্রুদের বিরুদ্ধে 'আক্রমণাত্মক' ব্যবস্থা নিতে কট্টরপন্থীদের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিচ্ছে।
গত মঙ্গলবার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) জেনারেল মোহাম্মদ রেজা নাকদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নতুন 'আক্রমণাত্মক নীতি' বাস্তবায়নের জন্য ছয়জন প্রবীণ সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে ইরান তাদের যুদ্ধপূর্ব রক্ষণাত্মক কৌশল থেকে সরে এসে শত্রুর ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ক্লিনগেনডাল ইনস্টিটিউট থিংক ট্যাংকের হামিদরেজা আজিজি সিএনএন-কে বলেন, "আক্রমণাত্মক অভিযান, ঐক্যবদ্ধ কমান্ড এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া থেকে বোঝা যায় যে, ইরানের নেতৃত্ব তাদের ঐতিহ্যগত সতর্কতামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ ব্যবস্থার দিকে এগোতে চাইছে।"
এই রদবদলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিয়োগ পেয়েছেন আইআরজিসি-র প্রধান (কমান্ডার-ইন-চিফ) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া আহমাদ ওয়াহিদি। খামেনি তাকে শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন।
ওয়াহিদির ওপর আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং বিদেশে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাকে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং খামেনির যুদ্ধপন্থী অবস্থানের প্রধান রূপকার হিসেবে মনে করা হয়। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনায় হস্তক্ষেপ এবং হরমুজ প্রণালিতে হামলার সমর্থক হিসেবে ওয়াহিদির পরিচিতি রয়েছে। তার এই নিয়োগের ফলে ইরান আরও কট্টর অবস্থানে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়াহিদি তার কাজে আইআরজিসি-র সাবেক প্রধান মহসিন রেজাইয়েরও সমর্থন পাবেন, যাকে সম্প্রতি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন প্রধান করা হয়েছে। রেজাই গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছিলেন, যদি ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত থাকে, তবে মার্কিন সেনারা বিপদে পড়বে।
এদিকে, ওয়াহিদি ও রেজাইয়ের এই নিয়োগকে কট্টরপন্থার প্রতি তেহরানের চরম প্রতিশ্রুতির প্রমাণ বলে আখ্যা দিয়েছে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক্স-এ তারা জানায়, "ইরানি শাসকগোষ্ঠী সন্ত্রাসের উপাসনা করে এবং এর কারিগরদের পুরস্কৃত করে সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে বসায়।"
অভ্যন্তরীণ বিষয়েও আরও কঠোর শাসনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। খামেনি আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজের নতুন প্রধান হিসেবে হোসেইন তায়েবকে নিয়োগ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এই বাসিজ বাহিনীই এ বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়ন চালিয়েছিল, যেখানে অন্তত ৭,০০০ মানুষ নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করা হয়; যদিও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। হোসেইন তায়েব এর আগেও বাসিজের নেতৃত্বে ছিলেন এবং ২০১০ সালের বিক্ষোভে হত্যা ও গ্রেপ্তারের কারণে তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এই নিয়োগ এমন এক সময়ে এল, যখন গত প্রায় ছয় মাস ধরে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তার বাবার (সাবেক সর্বোচ্চ নেতা) কম্পাউন্ডে হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। ওই হামলায় তার বাবা নিহত হওয়ার পরই তিনি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিযুক্ত হন। গত রোববার ইরান একটি ভিডিও প্রকাশ করে তাকে সুস্থ দেখানোর চেষ্টা করলেও, ধারণা করা হচ্ছে ভিডিওটি সংঘাতের আগের। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার'-এর মতে, এই রদবদলের মূল উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচির উন্নয়ন। এর মাধ্যমে খামেনি ও তার মিত্ররা নিজেদের ক্ষমতা আরও সুসংহত করে যুদ্ধবিরতি চাইতে থাকা উদারপন্থীদের কোণঠাসা করার কৌশল নিয়েছেন।