বিজ্ঞাপন
মায়ের হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন চাকরি, তার হাতেই প্রাণ গেল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম
বিজ্ঞাপন
মাকে হত্যার দায়ে কারাগারে যাওয়া কিশোরকে ক্ষমা করেছিলেন মার্থা ম্যাককে। বছরের পর বছর তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, প্যারোলে মুক্তির পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন, এমনকি কারাগার থেকে বের হওয়ার পর নিজের পারিবারিক সম্পত্তিতেই কাজের সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই দ্বিতীয় সুযোগের পরিণতি হয় মর্মান্তিক। ২০২০ সালে সেই ট্রাভিস লুইসের হাতেই নিহত হন মার্থা।
ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের হর্সশু লেক এলাকার ঐতিহাসিক স্নোডেন হাউসকে ঘিরে। একই পরিবারের মা ও মেয়ের মৃত্যুর সঙ্গে একই ব্যক্তির নাম জড়িয়ে যাওয়ায় ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত ট্রু ক্রাইম কাহিনিগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
ঘটনার শুরু ১৯৯৬ সালে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ৭৫ বছর বয়সী স্যালি স্নোডেন ম্যাককে এবং তার ৫২ বছর বয়সী ভাতিজা জোসেফ ‘লি’ বেকারকে হত্যা করা হয়। বেকার মেমফিসের পরিচিত ব্লুজ ও রক গিটারিস্ট ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের সময় ট্রাভিস লুইসের বয়স ছিল ১৬ বছর। তদন্তের পর তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিচার করা হয়। পরে তিনি হত্যার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন এবং ২৮ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড পান। তবে দোষ স্বীকার করলেও হত্যাকাণ্ডের জন্য অন্য একজন দায়ী বলে দাবি করে গিয়েছিলেন লুইস।
মাকে হারানোর পরও লুইসের প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হননি মার্থা। বরং কারাগারে থাকার সময় তার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্থা বিশ্বাস করতেন মানুষ পরিবর্তিত হতে পারে এবং লুইসও জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।
মার্থা তার প্যারোলে মুক্তির পক্ষেও সমর্থন দিয়েছিলেন। প্রায় ২৩ বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালে প্যারোলে মুক্তি পান লুইস।
এরপর আরও এক ধাপ এগিয়ে যান মার্থা। পরিবারের ঐতিহাসিক স্নোডেন হাউসে লুইসকে কাজ দেন তিনি। বাড়িটি সংস্কার করে বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট ও অনুষ্ঠান আয়োজনের ভেন্যু হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন মার্থা।
কিন্তু একসময় তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মার্থার পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাড়ির একটি ঝাড়বাতি বিক্রি করে পাওয়া ১০ হাজার ডলার হারিয়ে যাওয়ার পর লুইসকে সন্দেহ করেন তিনি। ওই অর্থ হারানোর সময় লুইস বাড়িতে ছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এরপর তাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেন মার্থা।
২০২০ সালের ২৫ মার্চ স্নোডেন হাউসে অ্যালার্ম বেজে ওঠার পর সেখানে ছুটে যান ক্রিটেনডেন কাউন্টি শেরিফের ডেপুটিরা। বাড়ির পেছনের একটি দরজা খোলা দেখতে পান তারা।
বাড়ির ভেতর তল্লাশি চালানোর সময় একজন ব্যক্তিকে দ্বিতীয় তলার জানালা দিয়ে লাফিয়ে পালাতে দেখেন পুলিশ সদস্যরা। পরে তাকে ট্রাভিস লুইস হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
শেরিফের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জানালা দিয়ে বেরিয়ে লুইস একটি গাড়িতে উঠে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু গাড়িটি বাড়ির আঙিনায় আটকে গেলে তিনি নেমে দৌড়ে পাশের হর্সশু লেকে ঝাঁপ দেন।
পানিতে ডুবে যাওয়ার পর তাকে আর ওপরে উঠতে দেখা যায়নি। পরে উদ্ধারকারী দল সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে লেক থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
এরপর স্নোডেন হাউসের ভেতরে পাওয়া যায় ৬৩ বছর বয়সী মার্থা ম্যাককের মরদেহ। তদন্তকারীরা জানান, তাকে ছুরিকাঘাত ও আঘাত করে হত্যা করা হয়েছিল।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় ছিল হত্যাকারীর পরিচয়। পুলিশ জানায়, মার্থাকে হত্যাকারী ট্রাভিস লুইসই ১৯৯৬ সালে তার মা স্যালি এবং আত্মীয় লি বেকারকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল।
অর্থাৎ যে ব্যক্তির অপরাধের কারণে মার্থা প্রথমে নিজের মাকে হারিয়েছিলেন, ২৩ বছরের বেশি সময় পর সেই ব্যক্তির হাতেই তার নিজের জীবনও শেষ হয়।
ঘটনার পর মার্থার পরিবারও জানিয়েছিল, তারা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে একই ব্যক্তি তাদের পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যুর জন্য দায়ী।
মার্থার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী সময়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। বিশেষ করে একজন দণ্ডিত হত্যাকারীকে ক্ষমা করা, তার পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা এবং তাকে আবার নিজের জীবনের এত কাছাকাছি নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।
তবে মার্থার সিদ্ধান্তকে কেবল সরল বিশ্বাস হিসেবে ব্যাখ্যা করাও পুরো ঘটনাটিকে তুলে ধরে না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, ক্ষমা ও মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনার প্রতি তার গভীর বিশ্বাস ছিল। লুইস প্রথম হত্যাকাণ্ডে নিজেকে নির্দোষ দাবি করায় সেই বক্তব্যও বিশ্বাস করেছিলেন মার্থা।
শেষ পর্যন্ত তার দেওয়া দ্বিতীয় সুযোগই এক ভয়াবহ পরিণতির সঙ্গে যুক্ত হয়। মায়ের হত্যাকারীকে ক্ষমা করে যে মানুষটিকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করেছিলেন মার্থা ম্যাককে, সেই মানুষটির হাতেই ২৩ বছর পর নিজের জীবন হারান তিনি।