বিজ্ঞাপন
সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের জোটে যোগ দেবে ইরানও?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
বিজ্ঞাপন
মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে যখন একের পর এক সমীকরণ বদলাচ্ছে, তখন মক্কা থেকে এলো নতুন একটি বার্তা। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক নিজেদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত ৭ আগস্ট মক্কায় তিন দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যে কারও ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠেছে, এই জোটকে ইরান কীভাবে দেখছে।
তবে তিন দেশই বলেছে, তাদের চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। ইরানকে লক্ষ্য করেও এটি করা হয়নি বলে স্পষ্ট করেছে তারা।
ইরানের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া
তেহরানের প্রতিক্রিয়া এখন পর্যন্ত বেশ সংযত। ইরানের কর্মকর্তারা সরাসরি চুক্তিটির সমালোচনা না করে আঞ্চলিক ও মুসলিম দেশগুলোর সহযোগিতার বিষয়টি সামনে আনছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার বলেছেন, মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাইরের ক্ষতিকর শক্তির সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের ওপর নির্ভরতা ও ঐক্যের আহ্বান জানান। তবে ওই পোস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের চুক্তির সরাসরি উল্লেখ করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি নিয়ে ইরানের উদ্বেগের কারণ রয়েছে।
কেন উদ্বিগ্ন হতে পারে ইরান
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি নিয়ে গবেষণা করা ক্লিংএন্ডেল ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, চুক্তির সময়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের উত্তেজনাও বেড়েছে।
এ ছাড়া ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে ইরাকেও উদ্বেগ রয়েছে।
আজিজির মতে, তেহরানের আশঙ্কা হতে পারে, নতুন এই চুক্তি সৌদি আরবের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইয়েমেন, ইরাক কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইরানের ওপর সমন্বিত চাপ তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে।
সৌদি আরব-হুথি সংঘাত
চুক্তির পরও সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। রোববার হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের জিজানে আরামকোর একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার দাবি করেছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে আগুনের কারণ সম্পর্কে তারা বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরেও হুথির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি, এতে অন্তত সাতজন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন। হুথিরা জানিয়েছে, তারা অস্ত্রের গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কমার নমুনা?
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো সৌদি–পাকিস্তান–তুরস্কের চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, তেহরান এই চুক্তিকে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ভূমিকা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেখছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্ট ও আইনবিষয়ক বিভাগের মহাপরিচালক হোসেইন নৌশাবাদি বলেন, এই চুক্তিকে পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা আধিপত্য দুর্বল হওয়ার সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তার মতে, ভবিষ্যতে বাইরের শক্তির পরিবর্তে আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতার ভিত্তিতে নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
সরাসরি হুমকি দেখছেন না অনেক বিশেষজ্ঞ
তবে সব ইরানি বিশ্লেষক এই চুক্তিকে তেহরানের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে দেখছেন না। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসরের মতে, এটি আপাতত যুক্তরাষ্ট্র-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি উপাদান।
তিনি মনে করেন, চুক্তিটি শুধু ইরানকে মোকাবিলা করার উদ্যোগ নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসেরও এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি অব কাতারের অধ্যাপক মেহরান কামরাভাও মনে করেন, ইরানের নীতিনির্ধারকেরা এখনই এই চুক্তিকে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন না। কারণ, ইরানের সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্ক—দুই দেশেরই কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কঠিন পরিস্থিতিতেও এই সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়নি।
কামরাভার মতে, চুক্তির প্রতীকী গুরুত্ব এখন বেশি। বাস্তবে তুরস্ক বা পাকিস্তান সৌদি আরবের হয়ে ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কা খুব একটা নেই।
ইরানে ভিন্নমতও রয়েছে
তবে ইরানের সবাই যে চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন, তা নয়। দেশটির কিছু কট্টরপন্থি রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই চুক্তি ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম আজিজি সতর্ক করে বলেছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাইরে থেকে আমদানি করা যায় না। এটি আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদেরই গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, ভুল হিসাব বা ভুল পদক্ষেপ বড় ধরনের পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
কমিশনের আরেক সদস্য ইব্রাহিম রেজাই বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগজে-কলমে চুক্তি করলেই সৌদি আরব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
ইরান কি ভবিষ্যতে এই জোটে যোগ দিতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশল হবে চুক্তিকে সরাসরি ইরানবিরোধী জোটে পরিণত হতে না দেওয়া। এ জন্য তেহরান সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক—তিন দেশের সঙ্গেই আলাদা করে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো বাইরের শক্তির পরিবর্তে এ অঞ্চলের দেশগুলোর হাতেই থাকা উচিত।
ক্লিংএন্ডেল ইনস্টিটিউটের আজিজির মতে, ভবিষ্যতে যদি এই চুক্তি ইরানকে ঠেকানোর একটি জোটে পরিণত হয়, তাহলে তেহরানের জন্য এতে যুক্ত হওয়া কঠিন হবে। তবে এটি যদি ধীরে ধীরে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় রূপ নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইরানের অংশগ্রহণের প্রশ্নও উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, দূর ভবিষ্যতে ইরান নিজেও এই ধরনের নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হতে পারে। তবে তার আগে পারস্য উপসাগর ও অঞ্চলজুড়ে সংঘাত কমানো এবং হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
অন্যদিকে মিশরের মতো আরব দেশগুলো ভবিষ্যতে এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—এমন আলোচনাও রয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা