Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

সৌদি আরবকে ঘিরে জল ঘোলা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম

সৌদি আরবকে ঘিরে জল ঘোলা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ

বিজ্ঞাপন

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সৌদি আরব। একদিকে রিয়াদের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সহযোগিতা, অন্যদিকে শত শত কোটি ডলারের উন্নত অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন। এই দুই সিদ্ধান্তকে ঘিরে অঞ্চলজুড়ে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

একই সময়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সৌদি সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলার হুমকি, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি এবং হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

সৌদিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল
মার্কিন প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এই প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির উন্নয়নে সহায়তা করবে। পাশাপাশি যৌথ সমীক্ষার মাধ্যমে দেশটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র স্থাপনের পথও উন্মুক্ত হতে পারে।

এ সিদ্ধান্তকে অনেক বিশ্লেষক মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে দেখছেন। কারণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসা ওয়াশিংটন এখন সৌদি আরবকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করতে চাইছে।

অবরোধের ঘোষণা হুথিদের, হুমকিতে তেল সরবরাহ
এর পাশাপাশি প্রায় ১৯৬ কোটি ডলার মূল্যের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র বিক্রিরও অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য, এই চুক্তি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করবে।

চুক্তির আওতায় সৌদি আরব সর্বোচ্চ ২০ হাজার অ্যাডভান্সড প্রিসিশন কিল ওয়েপন সিস্টেম (এপিকেডব্লিউএস) এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ারহেড সংগ্রহ করতে পারবে। মার্কিন নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এই অস্ত্রব্যবস্থা কম খরচে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং পার্শ্ববর্তী ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরী : পাকিস্তানের অবস্থান কী?
সৌদি আরবকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। গত বছর স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, যেকোনো এক দেশের ওপর আগ্রাসনকে উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এমন পরিস্থিতিতে যদি ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়, তাহলে পাকিস্তানের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
যদিও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে সংঘাত বিস্তারের বিরোধিতা করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি ইসলামাবাদের পূর্ণ সমর্থন অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সৌদি আরব ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে দেওয়া হুমকিরও নিন্দা জানিয়েছে পাকিস্তান।

প্রায় আট দশকের পাকিস্তান-সৌদি সম্পর্ক এখন নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, যৌথ মহড়া এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হতে পারে।

হুথি হুমকি ও নতুন উদ্বেগ
ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সম্প্রতি লোহিত সাগরে সৌদি সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে। এমন ঘোষণার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

হুথিদের এ ধরনের হুমকি নতুন নয়। তবে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে এই ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ, লোহিত সাগরে যেকোনো বড় ধরনের হামলা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও তীব্র
এদিকে যুদ্ধের ময়দানেও উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ নেই। যুক্তরাষ্ট্র টানা একাধিক রাত ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত এই সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হামলার দাবি করেছে। দেশটি বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে নতুন করে হামলার কথা জানিয়েছে। যদিও এসব দাবির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ শিগগিরই বড় ধরনের হামলা চালানো হতে পারে। এর জবাবে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এমন হামলা হলে পুরো অঞ্চলে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়বে।

কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে
যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি ইসলামাবাদ সফর করে পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সংঘাত প্রশমন এবং রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অবরোধের ঘোষণা হুথিদের, হুমকিতে তেল সরবরাহ
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না। ওয়াশিংটন দাবি করেছে, সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে দেশটির কাছে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রকৃত মজুত নিয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ হয়নি।

অন্যদিকে তেহরান জানিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক চাপ বা সামরিক হামলা সত্ত্বেও তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করবে না।

কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ ও লোহিত সাগর?
বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি। সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। একইভাবে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান নৌপথ হলো লোহিত সাগর।

এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পথের যেকোনো একটিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট সৃষ্টি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উৎপাদন ব্যয়েও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।

বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন সংকট দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি তাদের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যে নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়; বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা সফল হয়, সেটিই এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় নজরকাড়া বিষয়।

সৌদি-ইরান সম্পর্ক
সৌদি আরব যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয় এবং পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়, তাহলে ইরান সেটিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যদিও সৌদি আরব সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না বলে ধারণা করা হচ্ছে। রিয়াদ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ কারণে দেশটি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ালেও অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথও খোলা রাখতে পারে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার