Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাজ্যে আইএলআর নিয়ে সুখবর

১০ বছরের নিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান হাউস অব লর্ডসের

Icon

দ্য গার্ডিয়ান

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৩ পিএম

যুক্তরাজ্যে আইএলআর নিয়ে সুখবর

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের অধিকার (Indefinite Leave to Remain-ILR) নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসের জাস্টিস অ্যান্ড হোম অ্যাফেয়ার্স কমিটি। মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে কমিটি সরকারের অভিবাসন নীতি ও তথ্য ব্যবস্থাপনার কঠোর সমালোচনা করে স্থায়ী বসবাসের নিয়মে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্য ত্যাগ করা বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর নির্ভরযোগ্য তথ্য সরকারের কাছে নেই। ফলে বর্তমানে দেশটিতে ঠিক কতজন অভিবাসী অবস্থান করছেন, সে সম্পর্কেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্ভুল তথ্য নেই। এই পরিস্থিতিকে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুতর প্রশাসনিক দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেছে কমিটি।

বর্তমানে অধিকাংশ বৈধ অভিবাসী নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে সরকার এই সময়সীমা বাড়িয়ে ১০ বছর করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে।

হাউস অব লর্ডসের কমিটি এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে বৈধভাবে বসবাস করছেন এবং বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী স্থায়ী বসবাসের পথে রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম পেছনের তারিখ থেকে বা রেট্রোস্পেকটিভভাবে প্রয়োগ করার ধারণাকে অন্যায্য ও বৈষম্যমূলক বলে আখ্যা দিয়েছে কমিটি।

কমিটির মতে, দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট নিয়মের ওপর নির্ভর করে যারা জীবন পরিকল্পনা করেছেন, তাদের জন্য হঠাৎ করে নিয়ম পরিবর্তন করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হবে।

প্রতিবেদনে দক্ষ কর্মী, কেয়ার ওয়ার্কার এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য স্থায়ী বসবাসের প্রক্রিয়া সহজ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো—পরিবারের সম্মিলিত আয় বিবেচনা করে প্রধান আবেদনকারীর সঙ্গে নির্ভরশীল ভিসাধারীদেরও একই সময়ে আইএলআরের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার পরিবার দীর্ঘ অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাবে এবং যুক্তরাজ্যে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও স্থিতিশীল হবে।

কমিটি আরও সুপারিশ করেছে, যেসব শিশু অল্প বয়সে যুক্তরাজ্যে এসেছে এবং দেশটিতেই বড় হয়েছে, তারা ১৮ বছর বয়সে পৌঁছালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা বা সেটেল্ড স্ট্যাটাস লাভ করবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ধরনের তরুণদের অধিকাংশই বাস্তবে ব্রিটিশ সমাজের অংশ হয়ে গেছে। ফলে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা সামাজিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।

বর্তমান ব্যবস্থায় অধিকাংশ বিদেশি কর্মীর ভিসা নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার সঙ্গে যুক্ত থাকে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কর্মীরা চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন।

হাউস অব লর্ডসের কমিটি এই ব্যবস্থার পরিবর্তে ভিসাকে নির্দিষ্ট কোম্পানির পরিবর্তে একটি কর্মসংস্থান খাতের সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে। এতে কর্মীরা একই খাতের মধ্যে সহজে চাকরি পরিবর্তন করতে পারবেন এবং শোষণ বা বৈষম্যের ঝুঁকি কমবে বলে মনে করছে কমিটি।

একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার জন্যও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কোনও উচ্চদক্ষ কর্মী যদি একটি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে একই খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন, তাহলে নতুন নিয়োগকর্তা পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের স্পনসরশিপ ব্যয়ের একটি অংশ ফেরত দিতে পারবে—এমন নমনীয় ব্যবস্থার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, অভিবাসীদের যথাযথ সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত না করলে স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ ও সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে।

কমিটি স্টোকপোর্ট ও এপিংয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর উদাহরণ টেনে বলেছে, স্থানীয় প্রশাসনের অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওয়েস্টমিনস্টারে অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও কমিটির একটি ছোট অংশ অর্থনৈতিক চাপের যুক্তিতে স্থায়ী বসবাসের সময়সীমা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে, তবে অধিকাংশ সদস্য এ ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।

তাদের যুক্তি, অভিবাসন নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ন্যায়সঙ্গত নীতিমালা প্রয়োজন। পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তা অভিবাসী, ব্যবসায়ী এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

হাউস অব লর্ডসের এই প্রতিবেদন আইন নয় এবং সরকার এর সব সুপারিশ গ্রহণে বাধ্য নয়। তবে এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে, যুক্তরাজ্যে আইএলআর বা স্থায়ী বসবাসের নিয়ম পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য এখনও তৈরি হয়নি।

বিশেষ করে বর্তমানে বৈধভাবে বসবাসরত এবং স্থায়ী সেটেলমেন্টের পথে থাকা লাখো অভিবাসীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—তাদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের পরিবর্তে ১০ বছরের নিয়ম পেছনের তারিখ থেকে কার্যকর করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের একটি শক্তিশালী অংশ প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে।

ফলে আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতি, আইএলআর প্রক্রিয়া এবং দক্ষ কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার