Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

গত এক দশকে ছয় প্রধানমন্ত্রী, কেন অস্থির ব্রিটিশ রাজনীতি?

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম

গত এক দশকে ছয় প্রধানমন্ত্রী, কেন অস্থির ব্রিটিশ রাজনীতি?

বিজ্ঞাপন

মাত্র ১০ বছরে ছয় প্রধানমন্ত্রী। আর কিয়ার স্টারমার সরে দাঁড়ালে সেই সংখ্যা দাঁড়াবে সাতে। আধুনিক ব্রিটিশ রাজনীতিতে এমন অস্থিরতা খুবই বিরল। প্রশ্ন উঠছে—যে দেশকে বিশ্বের অন্যতম পুরোনো ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র হিসেবে ধরা হয়, সেখানে কেন এত ঘন ঘন সরকারপ্রধান বদল হচ্ছে?

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রেক্সিট, দলীয় কোন্দল, অর্থনৈতিক সংকট, নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা এবং সংসদীয় ব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্য—সব মিলিয়েই দেশটিতে ঘন ঘন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ১০ বছরে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। স্টারমার সরে গেলে যুক্তরাজ্য এক দশকে সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর দেখা পাবে।

কেন এত দ্রুত প্রধানমন্ত্রী বদল হয়?

এর অন্যতম কারণ যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থা। দেশটিতে জনগণ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করে না। ভোটাররা সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত করেন। পরে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী হন। ফলে ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও নেতারা যদি কোনো প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা হারান, তাহলে সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই দল নতুন নেতা নির্বাচন করতে পারে। নতুন নেতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান।

ডেভিড ক্যামেরন (২০১০–২০১৬) : ব্রেক্সিটের ধাক্কায় শুরু

২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গণভোট বা ব্রেক্সিটের পর থেকে যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের হার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার গণভোটে ‘লিভ’ পক্ষের জয় ব্রিটিশ রাজনীতিকে আমূল বদলে দেয়। গণভোটে পরাজয়ের দায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, সেখান থেকেই বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা।

থেরেসা মে (২০১৬–২০১৯): ব্রেক্সিটেই বিদায়

ক্যামেরনের উত্তরসূরি থেরেসা মে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন। কিন্তু তার প্রস্তাবিত চুক্তি একাধিকবার পার্লামেন্টে প্রত্যাখ্যাত হয়। নিজের দল কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যেও তিনি সমর্থন হারাতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে দলীয় চাপের মুখে পদত্যাগ করেন।

বরিস জনসন (২০১৯–২০২২) : কেলেঙ্কারি ও দলীয় বিদ্রোহ

২০১৯ সালে বরিস জনসন ক্ষমতায় এসে ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগানে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। কিন্তু করোনা মহামারির সময় সরকারি ভবনে পার্টি আয়োজন নিয়ে ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি, নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন এবং মন্ত্রীদের গণপদত্যাগ তার অবস্থান দুর্বল করে দেয়। শেষ পর্যন্ত নিজ দলের এমপিদের সমর্থন হারিয়ে ২০২২ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

লিজ ট্রাস (সেপ্টেম্বর–অক্টোবর ২০২২) : মাত্র ৪৯ দিনের সরকার

বরিস জনসনের পর প্রধানমন্ত্রী হন লিজ ট্রাস। কিন্তু তার ঘোষিত কর-হ্রাস ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে। পাউন্ডের মান পড়ে যায়, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। দলীয় সমর্থন দ্রুত হারিয়ে মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন তিনি। ব্রিটিশ ইতিহাসে এটিই অন্যতম স্বল্পস্থায়ী প্রধানমন্ত্রিত্ব।

ঋষি সুনাক (২০২২–২০২৪): পদত্যাগ নয়, নির্বাচনে পরাজয়

লিজ ট্রাসের পর প্রধানমন্ত্রী হন ঋষি সুনাক। তার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। তিনি দলীয় বিদ্রোহে ক্ষমতা হারাননি। বরং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির কাছে পরাজিত হন। এরপর সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। অর্থাৎ সুনাকের বিদায় ছিল নির্বাচনী পরাজয়ের কারণে, কোনো অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকটের কারণে নয়।

এবার কি স্টারমারের (২০২৪–বর্তমান) পালা?

২০২৪ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও কিয়ার স্টারমার বর্তমানে তীব্র চাপের মুখে রয়েছেন। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে লেবারের খারাপ ফল, জনপ্রিয়তার পতন, মন্ত্রিসভার কয়েক সদস্যের পদত্যাগ এবং শতাধিক এমপির অসন্তোষ তার নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহামের জয়ের পর নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। বিবিসি, রয়টার্স, এপি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টারমার তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মন্তব্য করেছেন যে স্টারমার অভিবাসন ও জ্বালানি নীতিতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং তিনি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করবেন বলে মনে করেন।

ইতিহাসে কি এমন হয়েছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন নয়। ১৮২৭ থেকে ১৮৩৫ সালের মধ্যে সাতটি সরকার এবং ১৮৫২ থেকে ১৮৬৮ সালের মধ্যে আটটি সরকার পরিবর্তিত হয়েছিল। তবে আধুনিক যুগে পরিস্থিতি ভিন্ন। ১৯৭৯ থেকে ২০১৬—এই ৩৭ বছরে যুক্তরাজ্যে মাত্র পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন: মার্গারেট থ্যাচার, জন মেজর, টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন ও ডেভিড ক্যামেরন। অথচ ২০১৬ সালের পর মাত্র এক দশকেই সেই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে দেশটি।

কেন এত সহজে প্রধানমন্ত্রী বদলে যায়?

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, দেশটির জনগণ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করে না। ভোটাররা এমপি নির্বাচন করেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী হন। ফলে ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা যদি নেতার ওপর আস্থা হারান, তাহলে সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই নেতৃত্ব পরিবর্তন সম্ভব হয়। এ কারণেই থেরেসা মে, বরিস জনসন ও লিজ ট্রাসের মতো নেতাদের বিদায়ের জন্য নতুন জাতীয় নির্বাচনের প্রয়োজন হয়নি।

শুধু ব্যক্তি নয়, কাঠামোগত সংকটও আছে

ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সমস্যা শুধু নেতৃত্বে নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতেও চাপ তৈরি হয়েছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, অভিবাসন বিতর্ক, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা সংকট, জনঅসন্তোষ এবং দুই প্রধান দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করেছে। দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের পর থেকে যে হারে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছে, তা আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন।

উল্লেখ্য, ডেভিড ক্যামেরন ব্রেক্সিটে পরাজয়ের দায় নিয়ে, থেরেসা মে ব্রেক্সিট অচলাবস্থায়, বরিস জনসন কেলেঙ্কারি ও দলীয় বিদ্রোহে এবং লিজ ট্রাস অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চাপে বিদায় নেন। ঋষি সুনাক বিদায় নেন নির্বাচনে হেরে। আর এখন কিয়ার স্টারমারও নেতৃত্ব সংকটের মুখে। ফলে এক দশকে ছয় প্রধানমন্ত্রী দেখেছে যুক্তরাজ্য। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি শুধু নেতৃত্বের সংকট নয়; বরং ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতারও প্রতিফলন। তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), দ্য গার্ডিয়ান, আইটিভি নিউজ, গভ ডট ইউকে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার