Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

ইরানকে কাবু করতে গিয়ে উল্টো মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দেখল বিশ্ব

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:২২ পিএম

ইরানকে কাবু করতে গিয়ে উল্টো মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দেখল বিশ্ব

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে অবশেষে অবসান ঘটেছে ২৮ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটির। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত থাকবে। 

এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ও শত্রুদের দমনের ক্ষমতা যেমন বড় ধাক্কা খেয়েছে, তেমনি মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাও বিশ্বের সামনে প্রকাশ পেয়ে গেছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন যখন তার সীমিত অস্ত্রভাণ্ডার উজাড় করে দিচ্ছিল, তখন চীন অত্যন্ত গভীরভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এই ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা পর্যবেক্ষণ করেছে।

এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের একটি চরম ভুল হিসাব-নিকাশের ওপর ভিত্তি করে শুরু হয়েছিল। তারা ভেবেছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল এবং এই যুদ্ধ হবে সংক্ষিপ্ত ও সহজেই বিজয়ী হওয়ার মতো। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং মার্কিন হামলায় দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি স্কুল ধ্বংস হয়ে ১২০ জনেরও বেশি স্কুলছাত্রীসহ অন্তত ১৫০ জন বেসামরিক মানুষ মারা যান। 

ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভিডিও বার্তায় ইরানের সরকার পতনের যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই চরম আঘাতের পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের তরুণ ও আগ্রাসী কমান্ডারদের নেতৃত্বে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে।

আরও পড়ুন
ইরানের এই প্রতিরোধ ও পালটা কৌশল উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী আরব রাজতন্ত্রগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রতায় ফাটল ধরিয়েছে। এত দিন ধরে নিজেদের স্থিতিশীলতার দ্বীপ মনে করা এই দেশগুলোর ব্যবসায়িক মডেল এখন চরম হুমকির মুখে এবং এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বহু বছর লেগে যাবে। 

নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তারা এখন আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা না রেখে তাদের মিত্রতা বহুমুখীকরণের কথা ভাবছেন এবং ইরানের সাথে কীভাবে সহাবস্থান করা যায়, সেই পথ খুঁজছেন।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই আকস্মিকভাবে এই যুদ্ধ শুরু করা হয়। যুদ্ধের ফলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল হরমুজ প্রণালি, যা দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কৃষিকাজের জন্য জরুরি সার ও সেমিকন্ডাক্টরের কাঁচামাল পরিবহন করা হয়। এই দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে এবং আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের মতো দরিদ্র দেশগুলো মারাত্মক খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হয়। 

আরও পড়ুন
এখন দুই পাতার ১৪ দফার এই সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হচ্ছে এবং যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।

তবে এই সমঝোতা কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি নয়, বরং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো জটিল বিষয়গুলো ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য তোলা রইল। এই চুক্তিতে পূর্ণ অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও ইসরাইলকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে, যা নেতানিয়াহু সরকারকে চরম হতাশায় ফেলেছে। 

নেতানিয়াহু তার পুরো রাজনৈতিক জীবন যে শত্রুকে ধ্বংস করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই ইরানকে অক্ষত রেখে যুদ্ধ শেষ করায় তিনি এখন নিজ দেশে রাজনৈতিক বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন, যা আগামী অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনে তার জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

আরও পড়ুন
বর্তমানে অন্যতম প্রধান জটিলতা হিসেবে রয়ে গেছে লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক দখলদারিত্বের ঘোষণা। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল দখল করে রাখা এবং বৈরুতে সাম্প্রতিক ইসরাইলি বিমান হামলা মূলত এই শান্তি আলোচনা নস্যাৎ করার একটি চেষ্টা ছিল। কিন্তু তা ব্যর্থ করে আলোচনা আরও গতি পায়। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই নেতানিয়াহুর ওপর তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং ইসরাইল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আরও আগ্রাসন চালাবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়। 

সব মিলিয়ে, ২৮ ফেব্রুয়ারির যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বেসর্বা ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করে দিয়েছে এবং বিশ্বমঞ্চে মার্কিন পরাশক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখার লড়াইকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার