Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

বিদ্যুতের দাম সবচেয়ে কম যেসব দেশে, এত সস্তা হওয়ার কারণ কী?

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

বিদ্যুতের দাম সবচেয়ে কম যেসব দেশে, এত সস্তা হওয়ার কারণ কী?

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের কোনো দেশে যেখানে এক ইউনিট বিদ্যুতের জন্য গ্রাহককে গুনতে হয় কয়েক ডলার, সেখানে অন্য কোনো দেশে সেই একই বিদ্যুৎ পাওয়া যায় কয়েক পয়সার সমপরিমাণ দামে। জ্বালানি সম্পদের প্রাচুর্য, সরকারি ভর্তুকি, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক নীতি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা- এসব কারণই নির্ধারণ করে একটি দেশের বিদ্যুতের দাম কত হবে।

গ্লোবাল পেট্রোল প্রাইসেসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুতের দেশ ইরান। তালিকার শীর্ষ দশে রয়েছে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ। তবে কম দাম মানেই সব সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নয়- অনেক দেশে সস্তা বিদ্যুতের আড়ালে রয়েছে বড় ধরনের বিদ্যুৎ সংকটও।
২০২৬ সালে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুতের ১০ দেশ

দেশ /প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম

ইরান
প্রায় ০.৩৭ টাকা (০.০০৩ ডলার)

ইথিওপিয়া
প্রায় ০.৭৪ টাকা (০.০০৬ ডলার)

কিরগিজস্তান
প্রায় ১.৭২ টাকা (০.০১৪ ডলার)

ভুটান
প্রায় ১.৮৪ টাকা (০.০১৫ ডলার)

সুদান
প্রায় ১.৮৪ টাকা (০.০১৫ ডলার)

ইরাক
প্রায় ১.৮৪ টাকা (০.০১৫ ডলার)

কিউবা
প্রায় ১.৮৪ টাকা (০.০১৫ ডলার)

অ্যাঙ্গোলা
প্রায় ১.৯৬ টাকা (০.০১৬ ডলার)

জাম্বিয়া
প্রায় ২.৮২ টাকা (০.০২৩ ডলার)

মিশর
প্রায় ২.৯৫ টাকা (০.০২৪ ডলার)

(১ মার্কিন ডলার = প্রায় ১২২.৭৫ টাকা হিসেবে হিসাব করা হয়েছে)


ইরান: বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুতের দেশ
প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা মাত্র ০.০০৩ ডলার বা প্রায় ৩৭ পয়সা দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ইরান। এর পেছনে রয়েছে দেশটির বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের মজুত।

ইরানের কাছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুত এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত রয়েছে। ফলে অনেক দেশের মতো জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন হয় না এবং তুলনামূলক কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়।
এছাড়া দেশটির জ্বালানি খাত মূলত রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত। ফলে বাজারের প্রভাব ছাড়াই সরকার বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে। ২০২২ সালে ইরান তাদের জিডিপির ৩৬ শতাংশ জ্বালানি ভর্তুকিতে ব্যয় করেছে। এর লক্ষ্য হলো জনগণের জন্য বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী রাখা, স্থানীয় শিল্পকে সহায়তা করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।

ইথিওপিয়া: বিশাল বাঁধের শক্তিতে সস্তা বিদ্যুৎ
বিশ্বে দ্বিতীয় সস্তা বিদ্যুতের দেশ ইথিওপিয়া। সেখানে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম মাত্র ০.০০৬ ডলার বা প্রায় ৭৪ পয়সা।
দেশটির সরকার বিদ্যুৎকে আরও বেশি মানুষের নাগালে আনতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম (জিইআরডি) প্রকল্পের মাধ্যমে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উদ্বোধন ও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পন্ন হওয়া এই প্রকল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ৫,১৫০ মেগাওয়াট। এটি আফ্রিকার বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং এক লাফে ইথিওপিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ করে দিয়েছে।

ইথিওপিয়ার কিছু তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থাকলেও দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সরকার এ খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে জলবিদ্যুৎ থেকে, প্রায় ৮ শতাংশ বায়ুশক্তি থেকে এবং ২ শতাংশ তাপবিদ্যুৎ উৎস থেকে।
সরকারের লক্ষ্য দেশের ৯৬ শতাংশ নাগরিককে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের আওতায় আনা। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সহায়তায় চলতি বছরে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.১ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইথিওপিয়ার নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৬০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

কিরগিজস্তান: পাহাড়ি নদীর দেশ
মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম মাত্র ০.০১৪ ডলার বা প্রায় ১.৭২ টাকা।
দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। পাহাড়ি নদীগুলোর বিশাল নেটওয়ার্ক এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সরকার বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করে এবং গৃহস্থালি গ্রাহকদের জন্য ব্যাপক ভর্তুকি দেয়। ফলে গ্রাহকদের কাছ থেকে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম মূল্য নেওয়া হয়। ২০২৬ সালে প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ০.০১৮ ডলার, যা ২০২৭ সালে আরও ০.০০৪ ডলার বাড়তে পারে।
তবে শীতকালে নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশটিকে নিয়মিত বিদ্যুৎ আমদানি করতে হয়। কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং রাশিয়া থেকে বিদ্যুৎ এনে ঘাটতি পূরণ করা হয়।
এই নির্ভরতা কমাতে সরকার নারিন নদীতে ১,৮৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কামবারাতা-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে। প্রকল্পটি চালু হলে মৌসুমি আমদানি নির্ভরতা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভুটান: শতভাগ জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল
বিশ্বে যৌথভাবে চতুর্থ সস্তা বিদ্যুতের দেশ ভুটান। সেখানে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ০.০১৫ ডলার বা প্রায় ১.৮৪ টাকা।
পূর্ব হিমালয় থেকে নেমে আসা দ্রুতগতির হিমবাহ-উৎসারিত নদীগুলোর ওপর নির্ভর করে দেশটি শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
ভুটান প্রতিবেশী ভারতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ রপ্তানি করে থাকে। ফলে জলবিদ্যুৎ শুধু দেশটির প্রধান জ্বালানি উৎসই নয়, অন্যতম বড় বৈদেশিক আয়ের উৎসও।

সরকার গৃহস্থালি বিদ্যুতের ওপর ভর্তুকি দেয় এবং জলবিদ্যুতের কম উৎপাদন ব্যয় বিদ্যুতের মূল্য দীর্ঘমেয়াদে কম রাখতে সাহায্য করে।
তবে এই মডেলের বড় দুর্বলতা হলো আবহাওয়ার ওপর নির্ভরতা। বৃষ্টিপাত বা হিমবাহ গলার হার কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

সুদান, ইরাক ও কিউবা: কম দাম, কিন্তু বড় সংকট
সুদান, ইরাক এবং কিউবা- তিন দেশেই প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ০.০১৫ ডলার বা প্রায় ১.৮৪ টাকা। তবে এই কম দাম পুরো বাস্তবতা তুলে ধরে না।
সুদান বর্তমানে গৃহযুদ্ধের চতুর্থ বছরে রয়েছে। সংঘাতে দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে এবং লাখো মানুষ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
ইরাক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য এখনো আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। চলমান সংঘাতের কারণে সেই সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, ফলে প্রতিদিন দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা যাচ্ছে।
কিউবাতেও পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশটিতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটছে। ফলে এই তিন দেশের ক্ষেত্রে কম বিদ্যুৎ মূল্য মূলত প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত; এটি কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রতিফলন নয়।
ব্যবসার জন্য সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুতের দেশ
২০২৩-২০২৬ সময়কালের গড় হিসাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় নিম্নোক্ত দেশগুলোতে:

দেশ/প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম

কাতার
প্রায় ৪.৪২ টাকা (০.০৩৬ ডলার)

জাম্বিয়া
প্রায় ৪.৭৯ টাকা (০.০৩৯ ডলার)

সুদান
প্রায় ৪.৭৯ টাকা (০.০৩৯ ডলার)

ত্রিনিদাদ ও টোবাগো
প্রায় ৬.৫০ টাকা (০.০৫৩ ডলার)

উজবেকিস্তান
প্রায় ৮.২২ টাকা (০.০৬৭ ডলার)

সৌদি আরব
প্রায় ৮.৫৯ টাকা (০.০৭০ ডলার)

রুয়ান্ডা
প্রায় ৯.৪৫ টাকা (০.০৭৭ ডলার)


ভিয়েতনাম
প্রায় ৯.৫৮ টাকা (০.০৭৮ ডলার)

ভেনেজুয়েলা
প্রায় ৯.৯৪ টাকা (০.০৮১ ডলার)


এসওয়াতিনি
প্রায় ১১.০৫ টাকা (০.০৯০ ডলার)

বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা বিদ্যুতের দেশগুলোর তালিকা দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়- প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য, জলবিদ্যুৎনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সরকারি ভর্তুকিই কম দামের প্রধান ভিত্তি। তবে শুধু সস্তা বিদ্যুৎ থাকলেই হয় না; নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, কম দাম ও নির্ভরযোগ্য সেবার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই জ্বালানি নীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: গ্লোবাল প্রেট্রোল প্রাইস ডট কম, এক্সপ্যাট্রিয়েট গ্রুপ

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার