Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

প্রথমবারের মতো ভ্যাকসিন তৈরি করল এআই, রোগ প্রতিরোধে নতুন আশা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

প্রথমবারের মতো ভ্যাকসিন তৈরি করল এআই, রোগ প্রতিরোধে নতুন আশা

বিজ্ঞাপন

প্রথমবারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে এমন এক নতুন ধরনের ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এটি করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ধরনের ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে এবং ভবিষ্যৎ মহামারি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, এই প্রথম কোনো ভ্যাকসিনের মূল উপাদান বা অ্যান্টিজেন সম্পূর্ণভাবে এআইয়ের মাধ্যমে নকশা করা হয়েছে এবং পরে তা মানুষের ওপর পরীক্ষাও চালানো হয়েছে।

গবেষকদের মতে, ভ্যাকসিনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি শুধু কোভিড-১৯’র বিভিন্ন ধরন নয়, বরং প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম অন্যান্য করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেও কার্যকর হতে পারে। এসব ভাইরাসই ভবিষ্যতে নতুন মহামারির কারণ হতে পারে।

যদিও গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ইবোলা মোকাবিলার জন্য একই প্রযুক্তিভিত্তিক পৃথক ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করেছেন।

ভ্যাকসিন সাধারণত শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সংক্রমণ শনাক্ত করতে শেখায়, যাতে ভাইরাসের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। কিন্তু অনেক ভাইরাস দ্রুত রূপ পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটাতে সক্ষম হওয়ায় প্রচলিত ভ্যাকসিন অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যকারিতা হারাতে পারে। এ কারণেই কোভিড-১৯ ও মৌসুমি ফ্লুর ভ্যাকসিন নিয়মিত হালনাগাদ করতে হয়।

গবেষণা দলের সদস্য অধ্যাপক জোনাথন হিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় ভাইরাসের পেছনে ছুটছি। আমাদের লক্ষ্য হলো পরিস্থিতির আগেই প্রস্তুত থাকা।’ তার মতে, এই প্রযুক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে নতুন কোনো প্রাদুর্ভাব বা মহামারি শুরু হওয়ার আগেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি থাকবে।

এআই কীভাবে ভ্যাকসিনটি তৈরি করল

সাধারণত বিদ্যমান কোনো ভাইরাসের ধরন বিশ্লেষণ করে ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়। কিন্তু কেমব্রিজের গবেষকরা বিভিন্ন করোনাভাইরাসের জিনগত তথ্য সংগ্রহ করেন, যেগুলো সম্ভাব্য ভাইরাস হুমকি শনাক্তের আন্তর্জাতিক নজরদারি কর্মসূচির মাধ্যমে পাওয়া গিয়েছিল।

পরে এসব জিনগত তথ্য একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। এআই এমন একটি ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’ তৈরি করে, যা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পুরো ভাইরাস পরিবারকে শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দিতে পারে। ফলে ভাইরাস রূপ পরিবর্তন করলেও বা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে নতুন সংক্রমণ ছড়ালেও সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

অ্যান্টিজেন হলো ভ্যাকসিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কারণ এটিকেই লক্ষ্য করে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

অধ্যাপক হিনি বলেন, ‘এআই-নকশা করা কোনো অ্যান্টিজেন এই প্রথম মানুষের ওপর পরীক্ষার পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানবকল্যাণে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা সত্যিই বিস্ময়কর।’

তার ভাষায়, ‘এটি শুধু আজকের ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যতের প্রাদুর্ভাব ও নতুন রোগের বিরুদ্ধে আগাম প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। মহামারির প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক পরিবর্তন।’

প্রাথমিক ফল আশাব্যঞ্জক

ভ্যাকসিনটির প্রথম ধাপের পরীক্ষায় ৩৯ জন অংশ নেন। মূল লক্ষ্য ছিল এটি নিরাপদ কিনা তা যাচাই করা। বর্তমানে প্রায় ২০০ জনকে নিয়ে দ্বিতীয় ধাপের গবেষণা চলছে, যার মাধ্যমে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এটি কতটা কার্যকরভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব ইনফেকশন-এ। সেখানে বলা হয়েছে, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব আপাতত ‘মধ্যম মাত্রার’ হলেও গবেষণাটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।

গবেষণার পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে যুক্ত সাউথ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সল ফস্ট বলেন, ‘এই এআইভিত্তিক নকশার মধ্যে অবশ্যই সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর।’

তার মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভাইরাসের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য মহামারির জন্য ভ্যাকসিন নকশা তৈরিতে এই প্রযুক্তি প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

ফ্লু ও ইবোলার বিরুদ্ধেও গবেষণা

কেমব্রিজের গবেষকরা বর্তমানে এমন একটি সার্বজনীন মৌসুমি ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়ে প্রাণীর ওপর গবেষণা করছেন, যা প্রতি বছর পরিবর্তন করার প্রয়োজন হবে না।

এ ছাড়া এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লু ভাইরাসের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন তৈরির কাজও চলছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, বর্তমানে পাখিদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করা এই ভাইরাস ভবিষ্যতে মানুষের মধ্যেও মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গবেষকরা ভাইরাল হেমোরেজিক জ্বরের বিরুদ্ধেও ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছেন, যার মধ্যে ইবোলা ভাইরাসের বিভিন্ন ধরন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বর্তমানে কঙ্গোতে যে প্রাদুর্ভাব চলছে, তার জন্য এখনো কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি।

এ গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন দলের পরিচালক অধ্যাপক এন্ডি পোলার্ড বলেন, প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় এই পদ্ধতি ইতোমধ্যে শক্তিশালী প্রমাণ তৈরি করছে।

তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় তথ্য। অনেকেই ধারণা করেননি যে এভাবে রোগপ্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।’

তবে মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে এটি কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ-এর বৈজ্ঞানিক পরিচালক অধ্যাপক মেরিন নাইট বলেন, ‘এআই-নকশা করা এই ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’-এর সফল পরীক্ষা ভাইরাসের বিরুদ্ধে বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি।’

সূত্র: বিবিসি

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার