Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানকে একঘরে করার মোদির প্রচেষ্টা যেভাবে ‘বুমেরাং’ হলো

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ০৮:১২ পিএম

পাকিস্তানকে একঘরে করার মোদির প্রচেষ্টা যেভাবে ‘বুমেরাং’ হলো

বিজ্ঞাপন

পোডিয়ামে হাত চাপড়ে পাকিস্তানের নেতাদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তখন গোধূলিলগ্ন। দক্ষিণ ভারতের রাজ্য কেরালার এক বিশাল জনসভায় সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনাদের একঘরে করতে ভারত সফল হয়েছে এবং আমাদের এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হবে। আমরা নিশ্চিত করব যেন আপনারা সারা বিশ্বে একঘরে হয়ে পড়েন।’

সময়টা ছিল ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর। এর কিছুদিন আগে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সশস্ত্র যোদ্ধাদের এক হামলায় ১৮ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন মোদি। ভারতীয় এই নেতা সে সময় বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের নেতাদের শুনে রাখা উচিত, আমাদের ১৮ জন সেনার আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।’

তবে এর এক দশক পর দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান একঘরে হওয়া তো দূরের কথা, বরং তারা এখন চীনের এক ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র। চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চীন সফর করেছেন। পাশাপাশি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও দেশটি আবার একটি বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

গত এক বছরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উভয়েই হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এমনকি চলমান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে ইসলামাবাদ। ট্রাম্পও প্রায়ই পাকিস্তানের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি আংশিকভাবে ট্রাম্পকে নিজেদের পক্ষে টানার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সাফল্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে পরাশক্তি ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোর কাছে নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিফলন। তবে সমানভাবে বিশ্লেষকেরা এও বলছেন যে, পাকিস্তানের এই ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক মর্যাদা মোদি সরকারের ভুল পদক্ষেপগুলোকেই স্পষ্ট করে তোলে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে পাকিস্তানকে দুর্বল ও একঘরে করার ভারতের যে কৌশল ছিল, তা বড় আকারে বুমেরাং হয়েছে।’

২০২৫ সালের মে মাসে ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পাকিস্তানের মুরিদকে-তে বিধ্বস্ত হওয়া বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপ। ছবি: আল-জাজিরা

যুদ্ধবিরতি এবং নোবেল মনোনয়ন

২০২৫ সালের ১০ মে ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, তিনি পারমাণবিক অস্ত্রধারী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ রাতের আলোচনার পর আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, ভারত ও পাকিস্তান একটি পূর্ণাঙ্গ এবং তাত্ক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’

এর পরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান এবং ড্রোন দিয়ে চার দিনের তীব্র লড়াইয়ের অবসান ঘটানো এই যুদ্ধবিরতি অর্জনে ট্রাম্পের ‘নেতৃত্ব এবং সক্রিয় ভূমিকার’ জন্য ধন্যবাদ জানান। এটি ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ লড়াই, যেখানে তাদের ভারী সামরিকায়িত সীমান্তের উভয় পাশে বেশ কয়েকজন নিহত হন।

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের ভূখণ্ডের গভীরে ‘সন্ত্রাসী’ আস্তানায় হামলা চালালে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল।

তবে শাহবাজ শরিফের মতো মোদি—যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং মাত্র কয়েক মাস আগেই ওভাল অফিসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন—তিনি কিন্তু নীরব থাকাটাই বেছে নেন, যদিও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এই যুদ্ধবিরতির কথা নিশ্চিত করেছিলেন।

এর কয়েক দিন পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মূল বিরোধের বিষয় কাশ্মীরের সমাধান খোঁজার ক্ষেত্রে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেন। যদিও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ বন্ধে ভূমিকা রেখেছিলেন, তবুও নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে ট্রাম্পের নিজেকে একজন শান্তিপ্রিয় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জাহির করার এই চেষ্টা ভারতের জন্য ছিল অস্বস্তিকর। কারণ ভারত দীর্ঘকাল ধরে এটিই দাবি করে আসছে যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে তাদের বিরোধ সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বিষয় এবং এটি তাদের নিজেদেরই সমাধান করতে হবে।

গত জুনে মোদি যখন কানাডা সফরে ছিলেন, তখন ট্রাম্প তাকে ওয়াশিংটনে যাওয়ার অনুরোধ জানান। মোদি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পরিবর্তে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ফোনে বলেন যে, নয়াদিল্লি কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা গ্রহণ করবে না এবং মে মাসের যুদ্ধবিরতি ছিল সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফল।

তবুও মে মাসের যুদ্ধবিরতি নিয়ে দাবির এই পাল্টাপাল্টি চলতেই থাকে। ট্রাম্প এরপর থেকে ৩০ বারেরও বেশি দাবি করেছেন যে, তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছিলেন। তিনি এমনও দাবি করেন যে, তিনি একটি পারমাণবিক যুদ্ধ এড়াতে সক্ষম হয়েছেন, যা লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, যুদ্ধের প্রথম দিনেই ভারতের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছিল, যা বেশ কয়েকটি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করার পাকিস্তানি বিবৃতিরই প্রতিধ্বনি।

বিশ্লেষকদের মতে, নয়াদিল্লি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এটিও প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে যে, ২০২৫ সালের মে মাসের লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটানো ওই হামলায় আদৌ পাকিস্তানের কোনো ভূমিকা ছিল।

আটলান্টিক কাউন্সিলের কুগেলম্যান ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মনোরম শহর পহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘বিশ্ব সম্প্রদায় ভারতকে হামলা চালাতে কোনো উৎসাহ দেয়নি... বিশ্ব নেতারা লক্ষ্য করেছেন যে, পহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ ভারত দিতে পারেনি।’ তার মতে, পাকিস্তান যেন ‘বয়ান তৈরির বৈশ্বিক লড়াইয়ে’ জয়ী হয়েছে।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘একটি সংঘাতে পাকিস্তান যে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে এবং ভারতের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে... এই বিষয়টি হোয়াইট হাউসসহ সারাবিশ্বে ব্যাপক মনোযোগ কেড়েছে।’

বিমান ভূপাতিত হওয়ার বিষয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে নয়াদিল্লির নীরবতা এই ধারণাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। দেশের শীর্ষ জেনারেল শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন যে পাকিস্তানের হাতে বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে, যদিও ভারত কখনোই সেই সংখ্যা নিশ্চিত করেনি।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কৃতিত্ব দিতে মোদির অস্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি অর্জনে ট্রাম্পের প্রচেষ্টাকে দ্রুত স্বীকৃতি দেয় এবং এমনকি তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে—যে পুরস্কার পাওয়ার জন্য ট্রাম্প নিজেকে যোগ্য বলে দাবি করে আসছেন।

ট্রাম্প, যিনি তার প্রথম মেয়াদে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘প্রতারণা ও মিথ্যার’ অভিযোগ এনেছিলেন, তিনি এরপর থেকে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরসহ পাকিস্তানি নেতৃত্বের বারবার প্রশংসা করেছেন, যিনি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এবং ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে ট্রাম্প জেনারেল মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান। এটিই প্রথম যে, কোনো পাকিস্তানি সামরিক প্রধান—যিনি দেশের প্রেসিডেন্ট নন—তাকে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানালেন। ট্রাম্প মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ এবং একজন ‘ব্যতিক্রমী মানব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন—যদিও নয়াদিল্লি এই পাকিস্তানি সামরিক প্রধানকে ভারতের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদের’ মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিত্রিত করে থাকে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির। ছবি: হোয়াইট হাউসের সৌজন্যে

‘সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না’

কয়েক দশক ধরে ভারত সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কৌশলগত সংযম’ নীতি অনুসরণ করে আসছিল।

নব্বইয়ের দশকে ভারত যখন তার অর্থনীতি উন্মুক্ত করে, তখন তারা নিজেকে অর্থনৈতিক বিষয়ে মনোযোগী একটি দায়িত্বশীল উদীয়মান শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে ভারত কূটনীতি এবং তার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাবকে ব্যবহার করে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করত।

এই নীতির কারণেই কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ভারত ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার জবাবে পাকিস্তানে হামলা চালানো থেকে বিরত ছিল। কিন্তু মোদির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিরোধী দলে থাকার সময় এই সংযমের জন্য কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করেছিল।

ক্ষমতায় আসার পর মোদি নিজেও প্রথম দিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছিলেন; তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান এবং শরিফের নাতনির বিয়েতে যোগ দিতে লাহোরে যান।

কিন্তু ২০১৬ সালের হামলার পর থেকে—যার জবাবে মোদি পাকিস্তানকে একঘরে করার মন্তব্য করেছিলেন—নয়াদিল্লি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্নির্ধারণ করে এবং এর জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে।

‘সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না’—এটিই হয়ে ওঠে মোদি সরকারের মূলমন্ত্র।

এর পরিবর্তে, পাকিস্তান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার জবাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংযমের মাত্রা কমিয়ে আনে ভারত। ২০১৬ সালের হামলার পর, ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ভেতরে ঢুকে একটি অভিযান চালায় এবং দাবি করে যে সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্যাম্প ছিল।

এরপর ২০১৯ সালে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলায় ৪০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর ভারতের যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের বালাকোটে হামলা চালায়—যা ২০১৬ সালের পদক্ষেপের চেয়েও অনেক বড় ছিল।

অনেক বছর ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের এই কঠোর অবস্থান কার্যকর বলেই মনে হচ্ছিল, এমনকি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এবং জোবাইডেনের প্রশাসনের সময়েও। মোদি প্রায়ই ওয়াশিংটন সফরে যেতেন। ট্রাম্প এবং বাইডেন উভয়েই ভারত সফর করেছেন, কিন্তু কেউই পাকিস্তানে যাননি।

তবে গত বছরের সামরিক সংঘাতের পর সেই সমীকরণ বদলাতে শুরু করে।

ট্রাম্পের অভিষেকের পর হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত প্রথম বিশ্বনেতাদের একজন ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মোদি তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে ২০ বছরেরও বেশি সময়ের কৌশলগত সম্পর্ক ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের কারণে আগেই চাপের মুখে ছিল, যার অধীনে ভারতকে বিশ্বের সর্বোচ্চ শুল্কের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বাণিজ্য আলোচনার মধ্যে এই শুল্কের হার কিছুটা কমলেও উত্তেজনা রয়েই গেছে।

চলতি সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন যখন ভারত সফরে আসেন, তখন তিনি নয়াদিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ট্রাম্প সেখানে ফোন করে বলেন যে, তিনি ‘ভারতকে ভালোবাসেন, মোদিকে ভালোবাসেন’।

কিন্তু ট্রাম্পের প্রশাসন বাণিজ্য ইস্যুতে ভারতের ওপর চাপ বজায় রেখেছে।

গত ২৩ মে ব্লিংকেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান যে, ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ঠিক এমন এক সময়ে যখন নয়াদিল্লির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেছে। তদুপরি, ব্লিংকেন ভারতের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিষয়টিকে যৌক্তিক বলে দাবি করেন এবং এর কারণ হিসেবে বাণিজ্য ঘাটতিকে উল্লেখ করেন—ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পণ্য বিক্রি করে বেশি, কিন্তু কেনে কম।

ভারতে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ব্লিংকেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ছায়া নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলছে কি না। ব্লিংকেন বলেন, তিনি বিশ্বের কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে ‘ভারতের সঙ্গে কৌশলগত জোটের ক্ষতি করে’ এমন হিসেবে দেখেন না।

তবে পাকিস্তানকে একঘরে করার ভারতের এই প্রচেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক একীভূতকরণের ক্ষতি করেছে—যদিও নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতির ব্যাপক পরিবর্তন তার প্রতিবেশীর তুলনায় ভারতের মর্যাদাকে দুর্বল করেছে।

ধাক্কা এবং পরিবর্তন

২০১৪ সালের মে মাসে মোদি যখন প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন তার অতিথিদের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার নেতারাও ছিলেন। ভারতীয় এই নেতা তার পররাষ্ট্রনীতিকে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি বলে বর্ণনা করেছিলেন।

কিন্তু এর দুই বছর পর, ২০১৬ সালের হামলার পর মোদি সরকার ঘোষণা করে যে তারা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করবে, কারণ ইসলামাবাদ ছিল এর আয়োজক।

সেই সম্মেলন বাতিল হয়ে যায়। এবং এরপর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রধান জোটের শীর্ষ নেতাদের কোনো বৈঠক আর অনুষ্ঠিত হয়নি। এর পরিবর্তে, ভারত বিমসটেককে (BIMSTEC) এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা পাকিস্তান ছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর একটি জোট। তবে এটিও একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে।

ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইমেরিটাস অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমদ বলেন, ‘পাকিস্তানকে একঘরে করার তাড়নায় ভারত মূলত সার্ককে পরিত্যাগ করেছে।’

এদিকে, ভারতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদের পতনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতি হয়েছে।

চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক—যারা দীর্ঘকাল ধরেই একে অপরের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার—গত বছরের যুদ্ধের সময় আরও জোরালোভাবে সামনে এসেছে। যুদ্ধে পাকিস্তান চীনের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সফরকালে পাকিস্তানের সঙ্গে বেইজিংয়ের ‘অটুট’ সম্পর্কের প্রশংসা করেছেন।

কিন্তু মোদির অধীনে ভারত কেবল সার্ককেই পরিত্যাগ করেনি; কিছু বিশ্লেষক বলছেন, নয়াদিল্লি তার ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতি থেকেও বিচ্যুত হয়েছে—যা হলো কোনো দেশের বলয়ে না ঢুকে সমস্ত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে কাজ করা।

১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকে ভারত ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’-এর নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল—যা ছিল ১২০টি সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের একটি জোট, যারা যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো পক্ষের জোটে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যুদ্ধ হোক বা নিষেধাজ্ঞা, ভারত কেবল জাতিসংঘের অনুমোদিত পদক্ষেপগুলোকেই সমর্থন করত।

ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র অ্যানালিস্ট প্রবীণ দোনথি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘গত এক দশকে ভারত তার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে বিশ্বমঞ্চে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী ও উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠেছে এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ, মূলত জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে’ আরও বেশি ‘লেনদেনমূলক’ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছে।

 ২০২৬ সালের ২৫ মে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে এক বৈঠকে অংশ নেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ছবি: রয়টার্স

এই নীতি থেকে সরে আসার প্রথম লক্ষণ দেখা গিয়েছিল মোদির পূর্বসূরি, কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলে। ২০১৩ সালে ওবামা প্রশাসন যখন পরমাণু আলোচনার মধ্যে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে দেশগুলোকে ইরানি তেল কেনা বন্ধের তাগিদ দিচ্ছিল, তখন ভারত ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা কমিয়ে দেয়।

কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি প্রয়োগ করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর, মোদি সরকার ইরান থেকে তেল কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।

ভারতের অন্যতম পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’-র কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল লিখেছিলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল ভারতের অর্থনীতিরই ক্ষতি করছে না, বরং এগুলো ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে অন্য দেশের ইচ্ছার কাছে নত করতে বাধ্য করছে এবং এটি ভারতের গর্বিত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতির ওপর একটি আঘাত।’

১৯৬৬ সালের জুলাই মাসে মস্কোতে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (ইউএসএসআর) পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো এবং কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ব্রেজনেভের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ছবি: গেটি ইমেজ

ইসরাইল এবং ইসলামোফোবিয়া

ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতেও ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে। নয়াদিল্লি ১৯৭৪ সালে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থাকে (পিএলও) স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম আরব বহির্ভূত দেশ ছিল এবং ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া বিশ্বের প্রথম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল।

ভারত ১৯৯২ সালে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে, যদিও এর আগে বহু বছর ধরে তারা গোপনে, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বজায় রেখেছিল।

শীতল যুদ্ধের পর দুই দশক ধরে তারা ধীরে ধীরে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, তবে ফিলিস্তিনের প্রতি দৃঢ় ও স্পষ্ট সমর্থন বজায় রেখে তার ভারসাম্য রক্ষা করেছিল।

তবুও মোদির অধীনে ভারত ইসরাইলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে—দেশটি এখন ইসরাইলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা। নয়াদিল্লি জাতিসংঘে ইসরাইলের সমালোচনা করে আনা প্রস্তাবগুলোতে ভোট দেওয়া থেকে ক্রমবর্ধমানভাবে বিরত থাকছে। গত মাসে ব্রিকস (BRICS) জোটের শীর্ষ সম্মেলনে তারা ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত সংক্রান্ত ভাষার তীব্রতা কমানোর চেষ্টা করেছিল, যা তথাকথিত দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে একটি বিচ্যুতি। তারা গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে একবারের জন্যও নিন্দা জানায়নি।

ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার ঠিক দুই দিন আগে মোদি ইসরাইল সফর করেন। এটি এমন এক সময়ে ঘটেছিল যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে একটি আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতের বিরোধী দলগুলো এই সফরকে ‘অসমোচিত’ বলে অভিহিত করেছে, কারণ তাদের মতে, এটি ভারতকে এই অঞ্চলে একটি পক্ষপাতদুষ্ট পক্ষ হিসেবে দেখাবে, যা তার জ্বালানি আমদানির প্রধান উৎস।

দোনথি বলেন, ‘ইসরাইলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের কারণে ইরানের যুদ্ধ ভারতকে একটি কঠিন অবস্থানে ফেলে দিয়েছে।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও মোদি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে তার বন্ধু বলে অভিহিত করেছেন। ইসরাইলের সঙ্গে এই প্রকাশ্যে হাত মেলানো উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ভারতের অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে। ঠিক এমন এক সময়ে এটি ঘটল, যখন পাকিস্তান তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব আরও গভীর করেছে।

গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, লেবানন ও ইরানে ইসরাইলের একাধিক যুদ্ধ এবং কাতার ও সিরিয়ায় বোমাবর্ষণের প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় দেশগুলো নিরাপত্তার জন্য কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ঐতিহ্যগত নির্ভরতার বাইরে বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে।

গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে—যা একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। কিছু প্রতিবেদনে এমন তথ্যও এসেছে যে, অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ এবং তুরস্ক—যা এই অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী—তারাও সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে।

আর গত মে মাসের যুদ্ধ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য দেশ হিসেবে পাকিস্তানের ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে; যার ফলে বাজারে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের চাহিদাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং চীনের তৈরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

এদিকে ভারতে মোদি সরকারের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী মুসলিমবিরোধী নীতি বাংলাদেশ থেকে শুরু করে মালদ্বীপ পর্যন্ত প্রতিবেশীদের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকেও মাঝেমধ্যে তিরস্কারের শিকার হতে হয়েছে।

২০২২ সালের মে মাসে বিজেপির তৎকালীন মুখপাত্র নুপুর শর্মা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন, যা সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষোভের সঞ্চার করে। সেখানে ভারতীয় দূতদের তলব করা হয় এবং জনসমক্ষে নিন্দা জানানো হয়। মুসলিম বিশ্বের ক্ষোভ শান্ত করতে বিজেপি পরে নুপুর শর্মাকে দল থেকে বরখাস্ত করে।

২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা, মসজিদ ভাঙচুর, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নাগরিকত্ব হরণ এবং মুসলিম উপাসনাকারী ও উৎসবের ওপর দমনপীড়নের খবর সংবাদপত্রের শিরোনামে আধিপত্য বিস্তার করেছে। অধিকার গোষ্ঠী এবং পর্যবেক্ষকেরা ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান তৈরিতে এই মুসলিমবিরোধী হামলাগুলোকে কাজে লাগিয়েছে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের অধীনে ইসলামাবাদ জাতিসংঘে ভারতে ক্রমবর্ধমান মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের বিষয়টি তুলে ধরে। এটি অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশনের (ওআইসি) সঙ্গে সমন্বয় করে জাতিসংঘের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে ১৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

২০১৭ সালের ৩ জুলাই মুম্বাইয়ে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যার ঘটনার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেন সাধারণ মানুষ। ২০১৪ সালে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে গবাদি পশু ব্যবসা বা গরুর মাংস খাওয়ার সন্দেহে বেশ কয়েকজন মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পকে পাকিস্তানের পক্ষে টানা

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং ক্রিপ্টো মাইনিং সংক্রান্ত চুক্তির মাধ্যমেতাঁর প্রশাসনকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে।

গত জুলাই মাসে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিরল খনিজ উপাদান সরবরাহের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে—যা উদীয়মান প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মূলত চীন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানের খনিজ খাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সেনাপ্রধান মুনির এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেন। পাকিস্তানি সেনাপ্রধানকে গত ডিসেম্বরে মিয়ামিতে ট্রাম্পের মার-এ-লাগো এস্টেটেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক দূত মাসুদ খান বলেন, ইসলামাবাদ গত এক বছরে ওয়াশিংটনে ব্যাপক অবস্থান তৈরি করেছে, বিশেষ করে মে মাসের যুদ্ধের পর তাদের ‘চতুর কূটনীতির’ কারণে।

তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ট্রাম্প এবং আসিম মুনিরের মধ্যকার এই সুসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত চুক্তির মাধ্যমে আরও জোরদার হয়েছে।’

পাকিস্তানের জন্য এই সুসম্পর্ক ওয়াশিংটনের সেই দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর করতে সাহায্য করেছে, যা তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ পাকিস্তানের দুইমুখী ভূমিকার অভিযোগ থেকে তৈরি হয়েছিল। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের অধীনে পাকিস্তান আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অংশীদার ছিল।

কিন্তু ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে আফগান তালেবান যোদ্ধাদের আশ্রয় ও সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও ছিল। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে পাওয়া এবং হত্যা করার ঘটনাটি ইসলামাবাদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

সেই সময় জুড়ে ভারতের একাধিক সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহের পেছনে থাকার অভিযোগ এনেছিল এবং এই উত্থানকে আল-কায়েদার মতো বৈশ্বিক ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একটি ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছিল।

প্রায় দুই দশক ধরে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে একটি নির্ভরযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছিল। একের পর এক ভারতীয় সরকার জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছে এবং ইসলামাবাদের কথিত ‘সন্ত্রাসী’ অর্থায়নের ওপর নজরদারির জন্য চাপ দিয়েছে। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পর ভারত এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করে, যেখানে অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছিল।

ইসলামাবাদ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বিশ্বজুড়ে নজরদারির মুখোমুখি হয়েছিল এবং এর সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছিল। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার কারণে পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। বিনিয়োগ কমে গিয়েছিল, বিশ্বনেতারা ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছিলেন এবং খেলাধুলার ইভেন্টগুলো বাতিল করা হয়েছিল—যা পাকিস্তানকে একঘরে করে দিয়েছিল, ঠিক যেমনটি ভারত চেয়েছিল।

কিন্তু কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমদ বলেন, ‘ভারত ভেবেছিল ৯/১১-এর পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের তৈরি বয়ান স্থায়ী রূপ নিয়েছে।’

এর পরিবর্তে, তিনি বলেন, ইসলামাবাদ নীরবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্নির্মাণ করতে শুরু করে, যার মধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতা এবং তাদের অর্থায়নকে লক্ষ্যবস্তু করা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০০৮ সালের ২৭ নভেম্বরের একটি ফাইল ছবি, যেখানে ভারতের মুম্বাইয়ের তাজ হোটেল ভবন থেকে ধোঁয়া ওঠার পর দমকলকর্মীদের আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর শুরু হয়ে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত চলা এই হামলায় অন্তত ১৬৫ জন নিহত এবং অন্তত ৩০৮ জন আহত হন। একমাত্র জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার হওয়া হামলাকারী আজমল আমির কাসাব দাবি করেছিলেন যে, হামলাকারীরা পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য ছিল। ছবি: ইপিএ

তিনি বলেন, ‘এটি দশকের পর দশক ধরে চরমপন্থার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বেদনাদায়ক শিক্ষা নিয়েছে এবং আদর্শিক সংঘাতের চেয়ে কূটনীতি, যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক একীভূতকরণের ওপর জোর দিয়েছে।’

তিনি বলেন, পাকিস্তানকে ‘কেবল সংকটের প্রতিক্রিয়া জানানো দেশ হিসেবে নয় বরং আঞ্চলিক ফলাফল নির্ধারণকারী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তান এমন অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি যা একই সঙ্গে ওয়াশিংটন, তেহরান, রিয়াদ এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সক্ষম, যা তাদের বর্তমান অবস্থানকে ৯/১১-পরবর্তী সময়ের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই করে তুলেছে।’

সাম্প্রতিক কিছু লক্ষণ ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত সম্ভবত তার এই কৌশলের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের সাবেক সেনা জেনারেল এবং অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকেরা গত তিন মাসে দুবার বৈঠক করেছেন।

মোদির ক্ষমতাসীন বিজেপির আদর্শিক অভিভাবক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) এক জ্যেষ্ঠ নেতা পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর পক্ষে মত দিয়েছেন—এবং ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরবণে সেই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন।

ইতোমধ্যে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে, যা গত এক বছরে কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্লিংকেনের এই ভারত সফর ছিল সেই সম্পর্ককে পুনর্নির্ধারণ করার একটি পদক্ষেপ।

ভারত-মার্কিন উত্তেজনা

কিন্তু ব্লিংকেনের এই সফর ভারতের কাঙ্ক্ষিত সেই বড় সাফল্য নয়। ২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্পের সঙ্গে সেই ফোনালাপের সময়, যখন মোদি দাবি করেছিলেন যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি দ্বিপাক্ষিকভাবে হয়েছে, তখন ভারতীয় নেতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

২০২৬ সালের ২৬ মে নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর করমর্দন করছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (বামে) এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বাণিজ্য ঘাটতির কথা উল্লেখ করে ভারতের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্কের পক্ষে সাফাই গান রুবিও। ছবি: এএফপি

এর প্রায় এক বছর পরও ট্রাম্প এখনো ভারত সফর করেননি, যদিও তিনি গত সপ্তাহে চীন সফর করেছেন এবং বলেছেন যে তিনি ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করতে পাকিস্তানে যেতেও প্রস্তুত। সব সময় পরিস্থিতি এমন ছিল না।

বিগত ২৫ বছরে চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট- জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা, ট্রাম্প নিজে এবং জো বাইডেন ভারতের সঙ্গে একটি বিকাশমান সম্পর্কের তদারকি করেছেন। ওয়াশিংটন ভারতকে এক বিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যার একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং চীনের উত্থানের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য হিসেবে দেখেছিল। চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্টই ভারত সফর করেছেন; ওবামা এসেছিলেন দুবার। এর বিপরীতে বুশের পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান সফর করেননি।

চীনের ভারসাম্য বজায় রাখার অভিন্ন স্বার্থের অংশ হিসেবে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা তাদের দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করেছিলেন। ভারত, যা ঐতিহাসিকভাবে তার সিংহভাগ অস্ত্রের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা ক্রমবর্ধমানভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য অস্ত্র কিনতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চতুর্পক্ষীয় নিরাপত্তা সংলাপ বা কোয়াড (Quad) গঠন করে, যার অলিখিত কিন্তু স্পষ্ট লক্ষ্য ছিল এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা।

কিন্তু ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এশিয়ার ওপর মনোযোগ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে ২০২৫ সালের ১৩ মে ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় লিখেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র কোয়াডের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। এই জোটের নেতাদের একটি শীর্ষ সম্মেলন, যার জন্য মোদি ট্রাম্পকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তা ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত হয়নি এবং এটি আবার কবে অনুষ্ঠিত হবে তা স্পষ্ট নয়—যদিও ব্লিংকেন নয়াদিল্লিতে কোয়াডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন।

গোখলে লিখেছেন, ‘মনে হচ্ছে ভারত ভৌগোলিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। এটি সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে নয়াদিল্লি অনিচ্ছুক এবং পশ্চিম প্যাসিফিকের নিরাপত্তার জন্য বৃহত্তর দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতার অভাব রয়েছে। তারা বিকল্পের সন্ধান করছে।’

এশিয়ার পরিবর্তে ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে তার বেশির ভাগ শক্তি ব্যয় করেছেন শুল্ক যুদ্ধে যা বিশ্ব বাণিজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে; তার ‘মাগা’ (Make America Great Again-MAGA) ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে একটি অভিবাসনবিরোধী নীতিতে এবং ভেনিজুয়েলা ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে।

কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কৃতিত্ব দিতে মোদির অস্বীকৃতি তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে তিক্ত করে তুলেছে—তারা এর আগে দুবার একসঙ্গে জনসভায় অংশ নিয়েছিলেন, একবার টেক্সাসের হিউস্টনে এবং তারপর ভারতের আহমেদাবাদে।

ট্রাম্প ভারতের বিরুদ্ধে সংরক্ষণবাদেরও অভিযোগ এনেছেন, রাশিয়ার সস্তা অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করতে নয়াদিল্লির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন এবং ইরানে ভারতের একটি বড় বন্দর প্রকল্পের জন্য নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকার করেছেন। তার প্রশাসন এইচ-১বি (H-1B) ভিসা কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছে যা ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক ছিল। এবং ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলনের কিছু অংশ ভারতীয়দের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বর্ণবাদী মন্তব্য করতে শুরু করেছে।

২০০৫ সালের ১৮ জুলাই ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ (ডানে)। সিংহের আমলে ২০০৮ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ছবি: গেটি ইমেজ

‘এখনো শেষ হয়ে যায়নি’

তবুও বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা যে স্থায়ী হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সাংবাদিক আইলিয়া জেহরা মে মাসের শুরুতে ‘দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘এই কূটনৈতিক উত্থান মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনে রূপ নিতে পারবে কিনা, যা বর্তমান প্রশাসনের বাইরেও বজায় থাকবে এবং ওয়াশিংটনে পাকিস্তানকে যেভাবে দেখা হয় তার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।’

নয়াদিল্লির উত্তরে সোনিপতের জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ডিন শ্রীরাম চউলিয়া বলেন, ভারত-মার্কিন সম্পর্ক কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে তবে তা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘মার্কিন-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্ব এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর মানে এই নয় যে অংশীদারিত্ব নিজেই শেষ হয়ে গেছে।’ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভারত ‘প্যাক্স সিলিকা’-য় (Pax Silica) যোগ দিয়েছে, যা ‘সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রতিরক্ষা ও এআই-এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় উদ্যোগ।’

ব্লিংকেনের সাম্প্রতিক সফরের সময় ভারত কোয়াড দেশগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ কাঠামোর ঘোষণা দিয়েছে।

অর্থনীতি থেকে শুরু করে সামরিক মহড়া এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান পর্যন্ত দুই দেশ ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘তাই আমি বলব মার্কিন-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্বের কিছু অংশ এগিয়ে যাবে, তবে ট্রাম্প যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন ততদিন পূর্ণাঙ্গ অংশীদারিত্ব হয়তো দেখা যাবে না।’

চউলিয়া অবশ্য এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে আবার পাকিস্তানের সঙ্গে একই সমীকরণে মাপছে।

চউলিয়া বলেন, ‘আমি মনে করি না যে মার্কিন ব্যবস্থা পাকিস্তানকে ভারতের সমকক্ষ হিসেবে দেখে,’ তিনি উল্লেখ করেন যে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংগ্রামের বিপরীতে ভারত একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মার্কিন কোম্পানিগুলো ভারতীয় অর্থনীতিতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে; এর বিপরীতে পাকিস্তানে মার্কিন বিনিয়োগ নগণ্য

২০২৩ সালে জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী মোদি। বাইডেন ও মোদির নেতৃত্বে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছিল। ছবি: গেটি ইমেজ

সামনের পথ

তবুও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের মূল কাঁটাটি রয়েই গেছে, যা পর্যায়ক্রমে প্রতিবেশীদের মধ্যে সামরিক সংঘাতের রূপ নেয়।

ম্যাসাচুসেটস কলেজ অব লিবারেল আর্টসের নৃবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জুনায়েদ বলেন, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা প্রশমনের জন্য কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ‘কাশ্মীরিদের লক্ষ্য হবে সামরিকায়ন মুক্ত হওয়া, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং সহিংসতা ও নিপীড়নমূলক আইনের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া।’

কাশ্মীর বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত অঞ্চল, যেখানে এই মনোরম হিমালয় অঞ্চলে ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ভারতীয় সেনা মোতায়েন রয়েছে। কয়েক দশকের এই পুরোনো সংঘাতে ৬০ বা তার বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই কাশ্মীরের বেসামরিক নাগরিক। অধিকার গোষ্ঠীগুলো ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে কাশ্মীরিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।

২০১৯ সালে মোদি সরকার সংবিধানের একটি ধারা বাতিল করে যা কাশ্মীরকে আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা দিয়েছিল। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয় এবং এর রাজ্য মর্যাদা কেড়ে নিয়ে এটিকে নয়াদিল্লির সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কাশ্মীরকে বুটের নিচে রেখে ভারতের কী লাভ হচ্ছে?’

জুনায়েদ বলেন, কেবল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার আলোচনাই কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ এবং দুই দেশের মধ্যকার বিরোধের সমাধান করতে পারে। এই মুহূর্তে তিনি বলেন, ‘কাশ্মীর একটি বারুদের স্তূপ।’

কাশ্মীরি বংশোদ্ভূত জুনায়েদ আরও বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিহিত রয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতা, উগ্র জাতীয়তাবাদী বক্তব্য পরিহার, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ এবং যৌথ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বহুত্ববাদ পুনরুদ্ধারের মধ্যে। সেই যাত্রা কাশ্মীর থেকে শুরু হতে পারে, যেখানে একটি গণতান্ত্রিক সমাধান উপদ্বীপে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনবে।’

রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও কর্মী অচিন ভানাইক বলেন, ভারতের উচিত পাকিস্তানের ‘সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং সরকারি সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে পার্থক্য করা।’ তিনি যুক্তি দেন যে ভারত জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর শাস্তি দাবি করতে পারে। একটি অত্যন্ত সামরিকায়িত পারমাণবিক অঞ্চলে পাকিস্তানে হামলা চালানো বিপজ্জনক পরিস্থিতির ঝুঁকি বহন করে বলে তিনি জানান।

২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বর ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের শ্রীনগরের প্রধান বাজারে টহল দিচ্ছেন ভারতের আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা। কাশ্মীর বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিকায়িত অঞ্চল। ছবি: এপি

তিনি ভারত ও পাকিস্তানকে প্রকৃত সীমান্তের (লাইন অব কন্ট্রোল) উভয় পাশে ১০ কিলোমিটারের একটি সামরিকমুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যা একটি আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা বাহিনী দ্বারা তদারকি করা হবে।

আইসিজি (ICG)-র দোনথি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দুই প্রতিবেশী যদি তাদের মূল বিরোধগুলোর সমাধান না করে, তবে নতুন সংঘাত অনিবার্য।

তিনি বলেন, ‘ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাছে জিম্মি হয়ে আছে এবং এটি সম্ভবত এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।’ চীন যেভাবে সামরিকভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন করছে, তাতে ভারত আর ‘পাকিন্তানকে কেবল দ্বিপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার বিলাসিতা করতে পারে না,’ তিনি যোগ করেন।

হামলা, যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক শীতলতার এই চক্র ভাঙার একটিই উপায় আছে বলে পরামর্শ দিয়েছেন দোনথি।

তিনি বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানের একে অপরের উদ্বেগ এবং সংঘাতের সম্ভাব্য কারণগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করার জন্য উচ্চপর্যায়ের গোপন আলোচনা (ব্যাক চ্যানেল) চালু করতে হবে।’

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার