Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানকে কাছে টেনে বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক কৌশল, উদ্বেগে ভারত

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম

পাকিস্তানকে কাছে টেনে বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক কৌশল, উদ্বেগে ভারত

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে নতুন কূটনৈতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, শেখ হাসিনা-পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার আঞ্চলিক কূটনীতিতে আরও বেশি স্বাধীনতা ও কৌশলগত পরিসর তৈরির চেষ্টাসহ আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে চাইছে। তবে ঢাকার এই নতুন কৌশল নয়াদিল্লিতে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং দেশের অভ্যন্তরে ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

হংকং-ভিত্তিক অত্যন্ত প্রভাবশালী ইংরেজি সংবাদপত্র সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, বহু বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে ভারত ছিল সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনার অন্যতম উৎস। তবে এখন কিছু বাংলাদেশি কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ হচ্ছে পাকিস্তানে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতীকী পরিবর্তন নয়াদিল্লিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ঢাকা কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, তারও একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

গত ৪ থেকে ২১ মে পর্যন্ত লাহোরের সিভিল সার্ভিসেস একাডেমিতে নির্বাহী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন বাংলাদেশের ১২ জন জ্যেষ্ঠ আমলা। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ঢাকা ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করতে চাইছেন। আর এই পদক্ষেপ তারই প্রতিফলন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গতিপ্রকৃতি ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামপন্থি দলগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এতে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পুরোনো উদ্বেগ আবারও সামনে আসতে পারে।

ভারতীয় পর্যবেক্ষকেরা উল্লেখ করেছেন, অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা পাকিস্তানে গেলেও ই-গভর্ন্যান্স, পাবলিক পলিসি ও শিক্ষা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলকে এখনও স্বাগত জানাচ্ছে ভারত। একই সময়ে তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে গুছিয়ে নেয়ার উদ্যোগও নিয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘ টানাপোড়েন ছিল।

গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ। ভারতের হরিয়ানাভিত্তিক ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার মূলত এই অঞ্চলে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে ‘

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের মধ্যে একটি আবেগগত উপাদান ছিল। তবে এখন ঢাকা পারস্পরিক লাভজনক চুক্তি নিশ্চিত করতে আরও বাস্তববাদী ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে।

আগের টানাপোড়েন অনেকটা কাটিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ ধাপে ধাপে আবারও ভিসা কার্যক্রম চালু করেছে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধজনিত সংকটের সময় দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে জরুরি জ্বালানি সহায়তা দিয়েছে ভারত। জ্বালানির তীব্র সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত ডিজেলও সরবরাহ করেছে দেশটি।

শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘তারা ভারতের সঙ্গে কাজ করতে চায়। এ নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন যে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে ভারতের সহায়তা প্রয়োজন।’

বর্তমানে বাংলাদেশ ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের ‘অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত’ পাকিস্তানের উৎপাদন সক্ষমতা ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো বাংলাদেশের ‘আমদানি চাহিদা’ পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।

শ্রীরাধা দত্তের মতে, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। আর সেই কারণেই ঢাকা প্রশাসন সিভিল সার্ভেন্টদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সেখানে এগিয়ে নিয়েছে। কারণ তারা এতে কোনও ক্ষতি দেখেনি।

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক লেখক ও লন্ডনভিত্তিক গবেষক প্রিয়জিৎ দেবসরকার বলেন, বাংলাদেশে মোটামুটি দুটি ধারা রয়েছে। একটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যুক্ত রক্ষণশীল ধারা, অন্যটি ইসলামপন্থি ধারা, যারা পাকিস্তানের সঙ্গে আরও গভীর সহযোগিতা ও সম্পর্ক চায়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ধারাটি একটি ইসলামি উম্মাহর ধারণাকে সমর্থন করে, যেখানে পাকিস্তানের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশের একটি কাঠামো গড়ে উঠবে। তবে তিনি বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জটিল একটি প্রস্তাব। কারণ ইরান যুদ্ধের সময় জ্বালানি সংকট হোক বা কোভিড-১৯ মহামারির সময় সহায়তা— উভয় ক্ষেত্রেই ভারতই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল।’

ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক উদয় চন্দ্রের মতে, ঢাকার নতুন কৌশল দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা, রাষ্ট্রের মৌলিক অবস্থান বদলে ফেলার উদ্যোগ নয়। তিনি বলেন, ‘হাসিনা-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকার নিজের জন্য আরও বেশি কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করতে চাইছে। এর অর্থ হলো চীন ও পাকিস্তানের প্রতি দৃশ্যমান কূটনৈতিক তৎপরতা।’

চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহায়তার জন্য চীনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। নদীটি ভারতের শিলিগুড়ি করিডরের কাছ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত এই সরু ভূখণ্ড ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের এই কূটনৈতিক তৎপরতা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াবে, এটাই স্বাভাবিক।

উদয় চন্দ্র বলেন, ‘এখন উদ্বেগ হচ্ছে, ঢাকা হয়তো দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে নির্ধারণের ক্ষেত্রে চীন ও পাকিস্তানকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ভারতের স্পষ্টতই নতুন বাংলাদেশ নীতি প্রয়োজন। এই নীতি কার্যত কোনও দল বা ব্যক্তির ওপর কম নির্ভরশীল হবে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনমতকে আরও গুরুত্ব দেবে।’

তার মতে, সীমান্ত, পানি বণ্টন এবং ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার বিষয়গুলোর মতো ইস্যুতে নতুন সরকার প্রকাশ্যে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ এখনও ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অবস্থান, অভিন্ন সরবরাহব্যবস্থা এবং স্বল্প দূরত্বের পরিবহন ব্যবস্থা ভারত থেকে পণ্য সংগ্রহ ও বাণিজ্যকে অত্যন্ত কার্যকর এবং উভয় দেশের জন্য লাভজনক করে তুলেছে।

খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ওপর ‘উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল’। বিশেষ করে পেঁয়াজ, গম ও চালের মতো পণ্য এবং ৫০০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক খাতের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা তুলা ও সুতা আমদানির ক্ষেত্রে।

উদয় চন্দ্র বলেন, ‘যেখানে লাভ স্পষ্ট, যেমন জ্বালানি, সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে, সেখানে ঢাকা ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।’

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার