Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশদের নতুন ঠিকানা পর্তুগাল

Icon

পর্তুগাল প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ০৩:০৩ এএম

ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশদের নতুন ঠিকানা পর্তুগাল

বিজ্ঞাপন

পর্তুগালে বসবাসকারী যুক্তরাজ্যের নাগরিকের সংখ্যা গত দশকে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এআইএমএ (পর্তুগালের অভিবাসন, সংহতি ও আশ্রয় সংস্থা) থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালে যেখানে ১৬ হাজার ৫৫৯ জন ব্রিটিশ নাগরিক পর্তুগালে বসবাসের অনুমতির জন্য নিবন্ধিত ছিলেন, ২০২৪ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ২৩৮এ, অর্থাৎ প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি।

এই প্রবৃদ্ধি শুধু সংখ্যাগত নয়, বরং ব্রিটিশ নাগরিকদের জীবন পরিকল্পনা ও ইউরোপ ধারণার গভীর পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। যে পর্তুগাল একসময় শুধু রোদ, সাগর আর সস্তা ছুটির গন্তব্য হিসেবে পরিচিত ছিল, তা এখন ক্রমশ দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী বসতির দেশে পরিণত হচ্ছে যুক্তরাজ্যের বহু নাগরিকের কাছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে অবাধ চলাচলের সুবিধা হারানো অনেক ব্রিটিশকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। শেনজেন অঞ্চলে ৯০/১৮০ দিনের নিয়ম, ভবিষ্যতের ইটিয়াস (ETIAS)–সহ কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ফলে ইউরোপে থাকা বা ঘন ঘন আসা যাওয়া করতে চাইলে আনুষ্ঠানিক আবাসিকতা নেওয়া এখন অনেকের কাছেই কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

এই প্রেক্ষাপটে পর্তুগাল তুলনামূলক সহজ রেসিডেন্সি ভিসা, ভালো আবহাওয়া, তুলনামূলক সাশ্রয়ী জীবনযাত্রার ব্যয় এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশের কারণে আলাদা হয়ে উঠেছে। লিসবন, কাসকাইশ ও আলগার্ভ অঞ্চলে ব্রিটিশ পরিবার, অবসরপ্রাপ্ত ও উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; অন্যদিকে পোর্তো ও আশপাশের শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছেন তরুণ রিমোট ওয়ার্কার ও ডিজিটাল নোম্যাডরা, যারা উন্নত ইন্টারনেট অবকাঠামো ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের সুবিধা নিচ্ছেন।

পর্তুগালের বিভিন্ন নীতি উদ্যোগও এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। অবসরপ্রাপ্ত ও প্যাসিভ আয়–নির্ভর ব্যক্তিদের জন্য D৭ ধরনের রেসিডেন্সি ভিসা, রিমোট ওয়ার্কারদের জন্য পৃথক ভিসা, এবং বিনিয়োগ ও দক্ষতা ভিত্তিক ভিসা পথ ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। অনেকেই যুক্তরাজ্যের উচ্চ আবাসন খরচ, ট্রাফিক, এবং চাপপূর্ণ নগরজীবন থেকে বেরিয়ে এসে পর্তুগালের ছোট শহর বা সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে তুলনামূলক শান্ত জীবন বেছে নিচ্ছেন, যেখানে একই আয়ে বড় বাসা, ভালো আবহাওয়া এবং প্রতিদিন বাইরে বেরিয়ে হাঁটা বা সাইক্লিং এর সুযোগ পাওয়া যায়। বেশ কিছু ব্রিটিশ পরিবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পর্তুগালে আসার পর তাদের শিশুদের স্কুলজীবন, পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্‌ সবকিছুই ইতিবাচকভাবে বদলেছে।

তবে এই বাড়তি জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। লিসবন ও পোর্তোর মতো শহরে বাড়িভাড়া ও সম্পত্তির দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে, যা স্থানীয়দের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ ফেলছে এবং ভাড়া–বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে ভাষা শেখা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নতুন আইন কানুন বোঝার চ্যালেঞ্জও ব্রিটিশ নতুন আগতদের সামনে রয়েছে। তা সত্ত্বেও, পর্তুগিজ সমাজের সাধারণ সহনশীলতা, ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগের সুবিধা এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে ডিজিটালাইজেশনের প্রসার অনেক ব্রিটিশের জন্য অভিযোজন প্রক্রিয়াকে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক করে তুলেছে।

অভিবাসন বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি বর্তমান নীতি ও অর্থনৈতিক প্রবণতা বড় কোনো ধাক্কা না খায়, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পর্তুগালে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং তারা বিদেশি সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে শীর্ষ সারির একটি গোষ্ঠী হিসেবেই থেকে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে পর্তুগাল শুধু ছুটির দেশে সীমাবদ্ধ না থেকে ক্রমেই এক বহুজাতিক, বহুসাংস্কৃতিক বসতি রাষ্ট্রে রূপ নিচ্ছে, যেখানে যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার