Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

হান্টাভাইরাস আতঙ্কে স্পেন: তিনজনের মৃত্যু, নজরদারিতে শতাধিক মানুষ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম

হান্টাভাইরাস আতঙ্কে স্পেন: তিনজনের মৃত্যু, নজরদারিতে শতাধিক মানুষ

বিজ্ঞাপন

হান্টাভাইরাস সাধারণ মানুষের কাছে এতদিন প্রায় অজানা একটি রোগ ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিক থেকে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচলকারী বিলাসবহুল অভিযাত্রী জাহাজ এমভি হন্ডিয়াসকে ঘিরে যে সংক্রমণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আর্জেন্টিনা, স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও আরও কয়েকটি দেশ একযোগে এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে কাজ করছে।

এমভি হন্ডিয়াস নামের ডাচ পতাকাবাহী এই জাহাজটি মার্চের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। জাহাজটিতে বিভিন্ন দেশের প্রায় দেড় শতাধিক যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। যাত্রাপথে এটি অ্যান্টার্কটিকা, দক্ষিণ আটলান্টিকের কয়েকটি দ্বীপ এবং পরে কেপ ভার্দের দিকে অগ্রসর হয়।

বর্তমান তদন্ত অনুযায়ী, সংক্রমণের সূচনা হয়েছিল এক ডাচ দম্পতির মাধ্যমে। তারা আর্জেন্টিনা, চিলি ও উরুগুয়ে ভ্রমণের সময় পাখি পর্যবেক্ষণ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, উশুয়াইয়ার একটি বর্জ্য ফেলার স্থানে ভাইরাসবাহী ইঁদুরের সংস্পর্শে এসে তারা আক্রান্ত হন। এরপর তারা এমভি হন্ডিয়াসে ওঠেন।

প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি এপ্রিলের শুরুতে অসুস্থতা অনুভব করেন। পরে জাহাজেই তার মৃত্যু হয়। শুরুতে মৃত্যুর কারণ স্বাভাবিক শ্বাসযন্ত্রজনিত জটিলতা বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে তার স্ত্রীও অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হলেও সেখানেই তার মৃত্যু হয়। পরে আরও কয়েকজন যাত্রীর মধ্যে একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন পর্যন্ত আটজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে পাঁচজনের শরীরে হান্টাভাইরাস নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস জানিয়েছেন, পরিস্থিতি গুরুতর হলেও সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি এখনও “নিম্নমাত্রার” রয়েছে।

এই প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে শনাক্ত হয়েছে “অ্যান্ডিজ” ধরনের হান্টাভাইরাস। এটি ভাইরাসটির একমাত্র পরিচিত ধরন, যা সীমিত আকারে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হতে পারে। তবে এ সংক্রমণ সাধারণত দীর্ঘসময় ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যেমন পরিবার বা একই কেবিনে থাকা যাত্রীরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টাভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মল, প্রস্রাব বা লালার মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমিত ধূলিকণা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ তৈরি হতে পারে। আক্রান্তদের মধ্যে জ্বর, শরীর ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং দ্রুত ফুসফুস বিকল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অ্যান্ডিজ ধরনের মৃত্যুহার কিছু ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

ঘটনা আন্তর্জাতিক মাত্রা পায় যখন জাহাজটি কেপ ভার্দেতে পৌঁছায়। দেশটি যাত্রীদের নামার অনুমতি দেয়নি। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানবিক ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধির আওতায় স্পেনকে সহযোগিতার অনুরোধ জানায়। শুরুতে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের আঞ্চলিক সরকার আপত্তি তুললেও শেষ পর্যন্ত স্পেন সরকার জাহাজটিকে টেনেরিফের কাছে নোঙর করার অনুমতি দেয়।

স্পেনের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজটি সরাসরি বন্দরে ভিড়বে না। প্রথমে জাহাজে থাকা সবাইকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। কেউ উপসর্গহীন থাকলে ছোট ছোট দলে নৌকায় করে তাদের টেনেরিফ বিমানবন্দরে নেওয়া হবে। সেখান থেকে নিজ নিজ দেশে পাঠানো হবে।

জাহাজে থাকা ১৪ জন স্প্যানিশ নাগরিককে বিশেষ সামরিক চিকিৎসা বিমানে মাদ্রিদের তোরেখোন বিমানঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হবে। পরে তাদের সামরিক হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ ও কোয়ারেন্টিনে রাখা হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ভাইরাসটির সুপ্তিকাল ছয় থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে আরও সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে কয়েকজন যাত্রী বিভিন্ন দেশে ফিরে গেছেন। সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসসহ আরও কয়েকটি দেশে তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড, আর্জেন্টিনা ও স্পেনের গবেষণাগারগুলো যৌথভাবে পরীক্ষা চালাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কয়েকটি দেশে পরীক্ষার সরঞ্জামও পাঠিয়েছে।

আর্জেন্টিনাও নতুন করে তদন্ত শুরু করেছে। উশুয়াইয়া এলাকায় ইঁদুরের মধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ অঞ্চলটিতে আগে কখনও হান্টাভাইরাসের এমন ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি। তবে গত এক বছরে দেশটিতে হান্টাভাইরাস সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি করোনাভাইরাস মহামারির মতো পরিস্থিতি নয়। কারণ হান্টাভাইরাস খুব সহজে বাতাসে ছড়ায় না এবং এর সংক্রমণ সীমিত। তবুও আন্তর্জাতিক সমন্বয়, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।

বর্তমানে এমভি হন্ডিয়াসকে ঘিরে যে স্বাস্থ্য সতর্কতা চলছে, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভাইরাসটির বিস্তার সীমিত রাখা গেলেও এটি প্রমাণ করেছে, পৃথিবীর এক প্রান্তে উদ্ভূত সংক্রমণ খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক উদ্বেগে পরিণত হতে পারে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার