বিজ্ঞাপন
পদত্যাগ করতে চান না মমতা—যা আছে সংবিধানে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৮:১০ পিএম
বিজ্ঞাপন
ভোটের ফলাফলে হেরেও তা মানতে নারাজ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, ‘নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে’—এই অবস্থান থেকেই আপাতত পদত্যাগ না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান কী বলে এবং প্রশাসনিক বাস্তবতায় কী ঘটতে পারে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়, সংবিধানে সরাসরি এমন পরিস্থিতির উল্লেখ নেই—যেখানে একজন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে পরাজিত হয়েও রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন না।
কারণ, সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রচলিত রীতিতে ফলাফলের তথ্য জানার পর বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ইস্তফা দেন এবং নতুন সরকার গঠনের পথ সুগম করেন। এই প্রথা আইনি বাধ্যবাধকতা না হলেও সাংবিধানিক শিষ্টাচারের অংশ হিসেবে বিবেচিত।
কী সেই প্রথা?
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজির রয়েছে ফল ঘোষণার পর পরাজয় বরণ করলে একটি নিয়ম মানতে হয় মুখ্যমন্ত্রীকে।
সেই নিয়ম হলো—ফলাফলের তথ্য নিশ্চিত হলেই রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মুখ্যমন্ত্রী।
এর পরেই প্রশস্ত হয় নতুন সরকার গঠনের পথ। প্রয়োজনে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী কেয়ারটেকার হিসেবে দায়িত্বে থাকেন।
রীতি বনাম সংবিধান
ভারতীয় সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর পদটি মূলত বিধানসভার আস্থার ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচনে পরাজয়ের মাধ্যমে সেই আস্থা কার্যত লোপ পায়।
ফলে নৈতিক ও সাংবিধানিক চর্চা অনুযায়ী পদত্যাগই প্রত্যাশিত পদক্ষেপ। তবে পদত্যাগপত্র জমা না দিলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাংবিধানিক শাস্তির বিধান নেই।
মেয়াদ শেষই চূড়ান্ত সীমা
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্তমান মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৭ মে। এই দিন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন মমতা। কিন্তু সেই তারিখ অতিক্রম করলেই, পদত্যাগপত্র দেওয়া হোক বা না হোক, তার মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হবে।
অর্থাৎ সাংবিধানিক কাঠামো নিজেই একটি ‘হার্ড স্টপ’ নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফলে পদত্যাগপত্র না দেওয়া হলেও নামের আগে জুড়ে যাবে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী।
রাজ্যপাল যে ভূমিকা নিতে পারেন
এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল পরিস্থিতি অনুযায়ী কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন—বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রীকে ‘কেয়ারটেকার’ হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা, প্রয়োজনে স্বল্প সময়ের জন্য প্রশাসনিক তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা।
তবে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হলে রাষ্ট্রপতি শাসনের পথও খোলা থাকে, যদিও স্বল্প সময়ের জন্য সাধারণত সেই পথে হাঁটা হয় না।
যে নজির রয়েছে ইতিহাসে
২০১১ সালে নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দ্রুতই তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন। যা সংসদীয় রীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। এমনকি রাজভবন থেকে সরকারি গাড়ি ছেড়ে দিয়ে দলের গাড়ি চেপে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের পার্টি অফিসে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই রীতি অনুসরণ না করলে তা হবে একেবারেই নজিরবিহীন।
এদিকে এবারের নির্বাচনে ভোটের ফলে পরাজিত হলেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ মঙ্গলবার বিকেলে কালীঘাট থেকে সংবাদ সম্মেলনে এসে পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।
মমতা বলেন, ‘কেন পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?’
আইন বিশেষজ্ঞরা যা বলেন
প্রতিবেদনে কলকাতা হাই কোর্টের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির বরাতে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে ‘কেয়ারটেকার’ বা তদারকি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন রাজ্যপাল। এমন ব্যবস্থা সম্ভব না হলে, স্বল্প সময়ের জন্য তিনি নিজেও প্রশাসনিক তদারকি করতে পারেন। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সাংবিধানিক সুযোগ থাকলেও, এত অল্প সময়ের ব্যবধানে সাধারণত তা প্রয়োগ করা হয় না—যদি না গুরুতর সংকট তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, এখন সামগ্রিক পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে বিজেপি পরিষদীয় দল কবে নতুন সরকারের শপথের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে তার উপর। এই প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না দিলেও তাৎক্ষণিক কোনও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে না। কারণ, বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের মেয়াদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে। তবে প্রতিষ্ঠিত রীতি না মানার সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে কী প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
যদিও নতুন সরকার গঠনের জন্য বিজেপি পরিষদীয় দলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও শপথের দিনক্ষণ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। ফলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলেও সাংবিধানিক কাঠামো স্পষ্ট—বিধানসভার মেয়াদ শেষ হলেই বর্তমান সরকারের অধ্যায়ও শেষ হবে।