বিজ্ঞাপন
ইরান যুদ্ধের দুই মাস: ট্রাম্পের সেই ‘নিশ্চিত জয়’ এখন বিশ্ব ধ্বংসের ফাঁদ! যুদ্ধে আসল জয়ী যারা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
বিজ্ঞাপন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন, তখন তিনি একটি দ্রুত এবং চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যুদ্ধের মাত্র ১০ দিনের মাথায় তিনি বড় গলায় দাবি করেছিলেন, আমেরিকা ‘ইতিমধ্যেই জিতে গেছে’। কিন্তু যুদ্ধের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও রণক্ষেত্রে কোনো চূড়ান্ত মীমাংসা তো আসেইনি, বরং এই সংঘাত এখন পুরো বিশ্বকে এক অন্তহীন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সাধারণ মানুষের হাহাকার: ধ্বংসস্তূপে ইরান ও লেবানন
যেকোনো যুদ্ধের মতো এখানেও সবচেয়ে বড় বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ইসরাইল ও আমেরিকার হাজার হাজার হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৬০০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১,৭০০ জনই সাধারণ নাগরিক। ট্রাম্প এমনকি ইরানের পুরো 'সভ্যতা' ধূলিসাৎ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
এদিকে ইরানের ভেতরেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শাসনামলে দমন-পীড়ন আরও কঠোর হয়েছে। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পাশাপাশি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৬০০ জনের বেশি মানুষের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।
লেবাননের অবস্থাও তথৈবচ। হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের সরাসরি লড়াইয়ে গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫০০ জন লেবানিজ প্রাণ হারিয়েছেন। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের একের পর এক গ্রাম মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘শক’: পকেটে টান পড়ছে সবার
এই যুদ্ধের উত্তাপ এখন পৌঁছে গেছে সাধারণ মানুষের ড্রয়িং রুমে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে তেলের বাজার টালমাটাল। আমেরিকায় মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৩.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। আইএমএফ সতর্ক করেছে যে, এই যুদ্ধ বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর কৃষিখাতকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
‘লস’-এর তালিকায় যারা: ট্রাম্প, উপসাগরীয় দেশ ও ইউক্রেন
ডোনাল্ড ট্রাম্প: রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প এখন চাপে। জনমত জরিপে তার জনপ্রিয়তা কমে ৩৭ শতাংশে ঠেকেছে। যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য তার আসন্ন নির্বাচনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপসাগরীয় দেশ: সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েত যারা এই যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে। বিশেষ করে ইরান 'হরমুজ প্রণালি' বন্ধ করে দেওয়ায় এসব দেশের তেল ও গ্যাস রপ্তানি মুখ থুবড়ে পড়েছে।
ইউক্রেন: ইউক্রেনের জন্য এই যুদ্ধ দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। আমেরিকার নজর এখন ইরানের দিকে থাকায় ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইলসহ অন্যান্য অস্ত্রের সরবরাহ কমে গেছে।
ছাইচাপা আগুনের মধ্যেও ‘জয়ী’ যারা
এত ধ্বংসলীলার মাঝেও হাতেগোনা কয়েকজন কৌশলগত সুবিধা আদায় করে নিয়েছে:
চীন: বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক হয়েও চীন বেশ স্থিতিশীল। তারা নিজেদের তেলের বিশাল মজুত গড়ে তুলেছে এবং এই সুযোগে বিশ্বে শান্তির দূত হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে।
রাশিয়া ও তেল কোম্পানি: তেলের আকাশছোঁয়া দামের কারণে রাশিয়ার জ্বালানি আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে, অক্সফাম-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ৬টি তেল কোম্পানি এই বছর প্রায় ৯৪ বিলিয়ন ডলার মুনাফা লুটবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অস্ত্র ব্যবসায়ী: তেলের বিকল্প হিসেবে সৌর ও বায়ু শক্তির চাহিদা বাড়ছে। আবার যুদ্ধের ডামাডোলে বিশ্বজুড়ে সমরাস্ত্র কেনাবেচা ২.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ট্রাম্পের দুই মাস আগের ‘নিশ্চিত বিজয়’ এখন এক দীর্ঘস্থায়ী চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধে ইরান যদি আত্মসমর্পণ না করে, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঝুঁকি আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।