বিজ্ঞাপন
এক ইরান যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এভিয়েশন, বিলাসী জীবন বদলে দিচ্ছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম
বিজ্ঞাপন
নীল আকাশ, শান্ত সমুদ্র, পাম গাছের সারি আর আকাশছোঁয়া অট্টালিকা- দুবাইয়ের পরিচিত চিত্র। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয় পাম জুমেইরাহের সৈকতে ক্লাবগুলো লোকারণ্য হয়ে ওঠে, দুবাই মলের ঝরনায় জমে পর্যটকের ভিড়, আর সূর্যাস্তের আলোয় ঝলমল করে বুর্জ খলিফা।
কিন্তু গত শনিবার সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় সবকিছু। কয়েক দশক ধরে যে শহরটি নিজেকে পুঁজি আর স্থিতিশীলতার নিরাপদ মরুদ্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, সেই দুবাইয়ের আকাশে শুরু হয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের গর্জন। বুর্জ আল আরবের মতো স্থাপনায় আছড়ে পড়ছে ধ্বংসাবশেষ, ফেয়ারমন্ট দ্য পাম হোটেল জ্বলে উঠছে আগুনের লেলিহান শিখায়। এক নিমেষেই বিলাসী জীবনের হাতছানি পরিণত হয়েছে যুদ্ধের আতঙ্কে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুবাইয়ের আধুনিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সুরক্ষিত বাণিজ্যিক শহর হিসেবে। এটি ওই অঞ্চলের আমোদ-প্রমোদ ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সেখানে বড় সব ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পন্ন এবং উদযাপন করা হয়। গত শনিবারের পর থেকে দেশটির বেশ কয়েকটি এলাকা কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকছে।
হামলায় দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ও জায়েদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জাবেল আলি পোর্টের একটি জেটিতে আগুনও ধরে। রক্ষা পায়নি আবাসিক এলাকাও। দুবাই মেরিনা, পাম জুমেইরা এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ‘ফেরামন্ট দ্য পাম’ হোটেলেও আগুন লাগে এবং প্রতীকী স্থাপনা বুর্জ আল আরব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্প্রতি ৩২৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হওয়া ফেয়ারমন্টের ক্ষতি উপসাগরীয় আতিথেয়তা খাতের উত্থানের ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাতের গুরুত্ব কেবল ভূ-রাজনৈতিক নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও বাণিজ্যের মরুদ্যান হিসেবে পরিচিত দুবাইয়ের অর্জিত সম্মানে বড় ধরণের আঘাত হেনেছে। এখানকার বাসিন্দাদের বড় অংশই বিদেশি নাগরিক। মূলত নিরাপত্তা আর করছাড়ের সুবিধার আশায় তাঁরা এ শহরে বসবাস করেন। হামলার পর সেই নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
দুবাই ছাড়তে ধনীদের হুড়োহুড়ি
ইরানের হামলার মুখে দুবাই ছাড়তে শুরু করেন অনেক ধনী বাসিন্দা ও বিদেশি নাগরিক। বাণিজ্যিক ফ্লাইট ব্যাহত হওয়ায় প্রাইভেট জেট হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা। চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় চার্টার ভাড়া রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মাসকাট থেকে ইস্তাম্বুলগামী ছোট নেক্সট্যান্ট জেটের ভাড়া এখন প্রায় ৮৫ হাজার ইউরো, যা স্বাভাবিকের প্রায় তিন গুণ। মস্কোগামী প্রাইভেট চার্টারে প্রতি আসন ২০ হাজার ইউরো। রিয়াদ থেকে ইউরোপে চার্টার ভাড়া উঠেছে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন লাখ ডলারে। ইউরোপ রুটে কিছু ক্ষেত্রে ভাড়া প্রায় ৯০ হাজার ইউরো পর্যন্ত।
এভিয়েশন খাতে ক্ষমতার পালাবদল?
দুবাই বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ট্রানজিট কেন্দ্র। ইউরোপ-এশিয়া-আফ্রিকার মাঝামাঝি অবস্থান এটিকে বৈশ্বিক সংযোগের কেন্দ্র বানিয়েছে। কিন্তু যদি আকাশপথ দীর্ঘ সময় ঝুঁকিপূর্ণ থাকে? যদি বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যায়? যদি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সতর্কতা অব্যাহত থাকে? তাহলে বৈশ্বিক এয়ারলাইন্সগুলো বিকল্প রুট খুঁজবে। ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য নির্ভরযোগ্যতা সবচেয়ে বড় শর্ত।
এই প্রেক্ষাপটে লাভবান হতে পারে তুরস্ক। ভৌগোলিকভাবে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত দেশটি। বিশেষ করে ইস্তাম্বুল ইতোমধ্যে একটি বড় এভিয়েশন ও ট্রানজিট হাব। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাড়লে বহু ফ্লাইটের ট্রানজিট ইস্তাম্বুলে চলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যে অচলাবস্থা
করোনা মহামারির পর উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভবত বিস্তৃত অর্থনৈতিক ধাক্কা খেলো। বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর বন্ধ, শেয়ারবাজারে ধস- সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের স্থিতিশীল অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে।
দুবাই ও আবুধাবিতে টানা বিস্ফোরণের ঘটনা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সৌদি আরব, ওমান, মিশর ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে। কোথাও লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিতও করা হয়েছে। বিমানবন্দর, বন্দর ও হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পর্যটন ও পরিবহন খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। আবাসিক এলাকাতেও হামলার ঘটনা মানুষের নিরাপত্তাবোধে আঘাত হেনেছে।
পবিত্র রমজানে করপোরেট ইফতার ও সাহরি উপসাগরীয় ব্যবসায়িক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানের আয়োজন বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য আরও চাপে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অর্থনীতির ভিত্তি- বাণিজ্য, লজিস্টিকস, পর্যটন সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে। তেলের দাম বৃদ্ধি সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা সেবাভিত্তিক অর্থনীতির ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবে না। আর ব্যবসায়িক আস্থার যে ক্ষতি হয়েছে, তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে গভীর হতে পারে।
‘নিরাপদ মরুদ্যান’ ধারণার অবসান?
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতে দুবাই কখনও ধ্বংস হবে না। অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এতে ধনকুবেরদের মানসিক স্বস্তি কি ফিরবে?
দুবাইয়ের অস্তিত্বই নির্ভর করত এক বিশ্বাসের ওপর- এটি অশান্ত অঞ্চলের মধ্যে ব্যতিক্রম শহর। ইরানের হামলা দেখিয়ে দিল, সেই ব্যতিক্রমও ভঙ্গুর। প্রমাণ হলো, মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত রাজনীতি থেকে দুবাই মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। এটি আবাসনের দাম কমিয়ে দিতে পারে এবং অস্থির বিনিয়োগকারীদের পুনরায় ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
দুবাইয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, শিগগিরই জীবন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে। কিন্তু বাসিন্দাদের মনে গেঁথে যাওয়া সেই আগুনের ছবি মুছে ফেলা কঠিন। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস বলছে, এখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ থাকলেও আগের সেই নিরাপদ স্বর্গের তকমা ফিরে পাওয়া অসম্ভব হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ‘বিজনেস বাবলটি’ যে কতটা ভঙ্গুর এবং মার্কিন-ইরান নীতির ওপর নির্ভরশীল- তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
বিজ্ঞাপন