বিজ্ঞাপন
মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় ৪ আক্রমণ, নতুন আতঙ্কে অস্ট্রেলিয়া
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:২৪ এএম
বিজ্ঞাপন
পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চারটি হাঙর-সংক্রান্ত হামলার ঘটনা গবেষকদেরও বিস্মিত করেছে। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসির সহযোগী অধ্যাপক ও হাঙর গবেষক ক্রিস পেপিন-নেফ একে অসাধারণ বলে বর্ণনা করেছেন। তার গবেষণা জীবনের ২০ বছরে এত অল্প সময় ও এত কাছাকাছি এলাকায় এমন ধারাবাহিক ঘটনা তিনি আর দেখেননি।
১৮ জানুয়ারি সিডনি হারবারে সাঁতার কাটার সময় হাঙরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১২ বছরের এক ছেলে। পরদিন, ১৯ জানুয়ারি সকালে ডি হোয়াই সৈকতে এক ১১ বছরের শিশুর সার্ফবোর্ডে হাঙরের কামড়ের ঘটনা ঘটে। একই দিন কয়েক ঘণ্টা পর কাছের ম্যানলি এলাকায় আরেক ব্যক্তি হাঙরের আক্রমণে গুরুতর আহত হন। এরপর ২০ জানুয়ারি, উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উত্তরে এক সার্ফারের বোর্ডে হাঙরের কামড়ে তার বুকে আঘাত লাগে।
এই দ্রুতগতির ঘটনাপ্রবাহ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সম্ভাব্য আরও হামলার আশঙ্কায় বহু সৈকত বন্ধ করে দেয়া হয়। একই সঙ্গে আবারও জোরালো হয়ে ওঠে হাঙর নিধনের দাবি। তবে বিশেষজ্ঞরা এসব দাবি নাকচ করে দিয়ে বলছেন, সমস্যার মূল হাঙর নয়, বরং পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট কিছু কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাঙরের হামলার পেছনে সাধারণত পরিবেশগত পরিস্থিতি বা পানিতে থাকা কোনো আকর্ষণীয় উপাদান দায়ী থাকে। সিডনির সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনার আগে কয়েক দিন ধরে টানা ভারী বৃষ্টি হয়েছিল। শহরের সরকারি আবহাওয়া কেন্দ্র জানায়, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ১২৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল, যা গত ৩৮ বছরে জানুয়ারির সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত।
আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র গবেষক রেবেকা অলিভ বলেন, এই পরিস্থিতি বুল শার্কের জন্য আদর্শ। বুল শার্ক উষ্ণ ও কম লবণাক্ত পানিতে স্বচ্ছন্দে থাকে, যেখানে অন্য অনেক প্রজাতির হাঙর টিকে থাকতে পারে না। ভারী বৃষ্টিতে নদী ও মোহনা দিয়ে বিপুল পরিমাণ মিঠা পানি সমুদ্রে প্রবাহিত হওয়ায় বুল শার্ক উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানির সঙ্গে নর্দমা ও পুষ্টি উপাদান সমুদ্রে পৌঁছে ছোট মাছ আকৃষ্ট করে, আর সেই মাছের পেছনেই আসে হাঙর।
ক্রিস পেপিন-নেফের ভাষায়, এটি ছিল এক ধরনের “পারফেক্ট স্টর্ম”। কম লবণাক্ত পানিতে হঠাৎ জীববৈচিত্র্যের বিস্ফোরণ ঘটে, উপকূলের কাছে উঠে আসে টোপ মাছ, তাদের পেছনে আসে বুল শার্ক, আর মানুষও থাকে একই এলাকায়। সেখান থেকেই সমস্যা তৈরি হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ৩০ বছরে অস্ট্রেলিয়ায় হাঙরের কামড়ের ঘটনা ধীরে ধীরে বেড়েছে। ১৯৯০-এর দশকে বছরে যেখানে আট থেকে দশটি ঘটনা ছিল, ২০১০-এর পর থেকে গড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে বছরে প্রায় ২০-এর ঘরে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মানে এই নয় যে হাঙর আগের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক হয়েছে। বরং উপকূলে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, জলক্রীড়ার প্রসার, উন্নত ওয়েটস্যুট ব্যবহারের ফলে মানুষ বেশি সময় পানিতে থাকছে, আর এসব কারণেই এমন আক্রমণ বেড়েছে। তবুও পানিতে নামা মানুষের অনুপাতে হামলার হার ততটা বাড়েনি।
রেবেকা অলিভের মতে, প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সমুদ্রে নামলেও হামলার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল, আর মৃত্যুর ঘটনা আরও কম। তিনি বলেন, উন্নত রিপোর্টিং ব্যবস্থা, ড্রোন ফুটেজ ও গণমাধ্যমের অতিরিক্ত মনোযোগের কারণেই মানুষ হাঙরকে এখন বেশি বিপজ্জনক মনে করছে।
সাম্প্রতিক ঘটনার পর আবারও হাঙর নিধনের দাবি উঠলেও বিজ্ঞানীরা একমত যে এটি কার্যকর সমাধান নয়। রেবেকা অলিভ বলেন, হাঙর নিধনের মাধ্যমে নিরাপত্তার একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করা হয়, কিন্তু বাস্তবে এতে পানিতে থাকা মানুষের ঝুঁকি কমে না। ক্রিস পেপিন-নেফও বলেন, গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে হাঙর নিধন কাজ করে না। এতে রাজনীতিক বা কিছু গোষ্ঠী স্বস্তি পেলেও প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
তার ভাষায়, মূল সমস্যা হাঙর নয়, বরং পানিতে থাকা সেই আকর্ষণীয় উপাদান, যা হাঙরকে টেনে আনে। উপকূলে সব হাঙর মেরে ফেললেও যদি সেই আকর্ষণ রয়ে যায়, অন্য জায়গা থেকে হাঙর আসবেই। তাই ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সচেতনতা বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ভারী বৃষ্টির পর সাঁতার বা সার্ফিং এড়িয়ে চলা, নিরাপদ ঘের তৈরি করা এবং সমুদ্রকে ‘বন্য পরিবেশ’ হিসেবে দেখা জরুরি। পেপিন-নেফ বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় মানুষ যেমন জঙ্গলে চলাচলে সতর্ক থাকে, সমুদ্রকেও তেমনভাবেই দেখতে হবে। সূত্র: বিবিসি
বিজ্ঞাপন