বিজ্ঞাপন
মায়ের ক্যানসার, চিকিৎসার অর্থ যোগাচ্ছেন মেয়ের নাটকের সাথীরা
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
বিজ্ঞাপন
ক্যানসারের নাম শুনলেই অনেক পরিবারের সামনে ভেসে ওঠে এক দীর্ঘ, কঠিন এবং ব্যয়বহুল লড়াইয়ের ছবি। চিকিৎসার পাশাপাশি থাকে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত এবং দিনের পর দিন অসুস্থ প্রিয়জনকে সামলে রাখার চাপ। সচ্ছল পরিবারের জন্যও এই পথ সহজ নয়। আর মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের কাছে সেই লড়াই কখনো কখনো হয়ে ওঠে সামর্থ্যের সঙ্গে প্রতিদিনের এক কঠিন হিসাব।
৫৭ বছর বয়সী শাহিন সুলতানার পরিবার এখন ঠিক এমনই এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের জুনে তার রেক্টাল ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর শুরু হয়েছে চিকিৎসা। এখন পর্যন্ত তিনটি কেমোথেরাপি নিয়েছেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসার পাশাপাশি কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন শাহিন। একদিকে মায়ের অসুস্থতা, অন্যদিকে চিকিৎসার বিপুল খরচ সব মিলিয়ে পরিবারটির স্বাভাবিক জীবন যেন থমকে গেছে।
এখন পর্যন্ত তার চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা। সামনে চিকিৎসার আরও ধাপ রয়েছে। কতদিন চিকিৎসা চলবে, আরও কত খরচ হবে তার হিসাবও নিশ্চিত নয়। চিকিৎসকদের মতে শাহিন সুলতানার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে এবং শরীর ধকল সামলে উঠতে পারলে ১২টি কেমোথেরাপি লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে খরচের হিসাব ৬৫ লাখ টাকার বেশি। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব অনেকটাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন শাহিনের মেজ মেয়ে ক্যামেলিয়া শারমিন চূড়া।
মায়ের জন্য নিজের পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ও পিছিয়ে দিতে হয়েছে তাকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যতত্ত্বে স্নাতকোত্তর করছেন তিনি। মায়ের অসুস্থতার কারণে শেষ পরীক্ষাটিও দিতে পারেননি। যে সময়ে নিজের পড়াশোনা, পরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই সময়টাতেই তিনি হয়ে উঠেছেন মায়ের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান সহায়।
শুধু হাসপাতাল, ওষুধ কিংবা চিকিৎসকের কাছে মাকে নিয়ে যাওয়াই নয় মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতেও এখন তাকে ছুটতে হচ্ছে। আর সেই লড়াইয়ের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে মঞ্চনাটক। এর আগে সোশ্যাল মিডিয়া এবং বন্ধুদের থেকে ১ লাখ ৮১ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছিলেন। তবে মধ্যবিত্তদের বেলায় একটা কথা আছে না, যে বুক ফাটে কিন্তু মুখ ফোটে না। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও কারো কাছে হাত পাততে পারেন না।
তাই মায়ের চিকিৎসার জন্য মেয়ের অন্যরকম লড়াই। নাট্যতত্ত্বের শিক্ষার্থী হিসেবে মঞ্চ তার কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু মঞ্চে দাঁড়ানোর অর্থ এখন তার কাছে শুধু অভিনয় কিংবা শিল্পচর্চা নয়। মঞ্চ হয়ে উঠেছে মায়ের চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহের একটি মাধ্যম।
‘টুগেদার উই ক্যান’ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি চ্যারিটির উদ্দেশ্যে মঞ্চনাটক করছেন। এই সংগঠনটি সুবিধাবঞ্চিত শিশু এবং এমন মানুষদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে, যারা বিপদে পড়লেও সহজে কারো কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে পারেন না।
শাহিন সুলতানার মতো মানুষের গল্পই যেন সেই উদ্যোগের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিলে যায়। কারণ অসুস্থতা যখন হঠাৎ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন সাহায্যের প্রয়োজন হলেও অনেক সময় কোথায় যেতে হবে, কার কাছে বলতে হবে সেটিই জানা থাকে না।
মায়ের জন্য সেই সাহায্যটুকু জোগাড় করতে গিয়ে মেয়েটি তাই নিজের পরিচিত জগতের সবচেয়ে কাছের জায়গা নাট্যমঞ্চকেই বেছে নিয়েছেন। ‘টুগেদার উই ক্যান’ এর সাহায্যে এর আগে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের একটি আয়োজনে মঞ্চনাটক করেছিলেন ক্যামেলিয়া। সেখান থেকে কিছু অর্থ পেয়েছিলেন। তার সহকর্মী এবং বন্ধুরা নিজেদের পারশ্রমিক পুরোটাই তুলে দেন ক্যামেলিয়ার হাতেই। তাদের নিয়েই আবার মঞ্চে উঠছেন ক্যামেলিয়া।
‘টুগেদার উই ক্যান’ এর উদ্যোগে এবার ২১-২২ আগস্ট মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে ‘সুজন বাদিয়ার ঘাট’। নাটকটি অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে। টিকিটের মূল্য রাখা হয়েছে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। একটি নাটকের টিকিট হয়তো কারও কাছে বিনোদনের মূল্য। কিন্তু এই মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে সেই টিকিটের অর্থ আরও একটি অর্থ বহন করছে এটি হয়ে উঠতে পারে একজন অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার পথে সামান্য সহায়তা। একজন দর্শক নাটক দেখতে যাবেন, কয়েক ঘণ্টা শিল্প উপভোগ করবেন; একই সঙ্গে তার কেনা টিকিটের অর্থের একটি অংশ পৌঁছে যেতে পারে এমন একটি পরিবারের কাছে, যারা চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
শাহিন সুলতানার স্বামী একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত। বয়সের কারণে তিনিও কিছুটা অসুস্থ। ফলে পরিবারের উপার্জন ও চিকিৎসার ব্যয়ের সমীকরণ আগের মতো নেই। তাদের তিন সন্তান। বড় মেয়ে স্কুলশিক্ষিকা। মেজ মেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যতত্ত্বে স্নাতকোত্তর করছেন। ছোট ছেলে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই ছিল তাদের জীবন। প্রত্যেকের আলাদা দায়িত্ব, আলাদা স্বপ্ন। বড় মেয়ের চাকরি, মেজ মেয়ের পড়াশোনা আর ছোট ছেলের স্কুলজীবন সব মিলিয়ে জীবন এগোচ্ছিল নিজের গতিতে। কিন্তু মায়ের অসুস্থতা যেন তাদের সাজানো জীবনে ঝড়ের মতো এসেছে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে চিকিৎসার পেছনে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়ে যাওয়া একটি পরিবারের জন্য কতটা বড় চাপ, তা আলাদা করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। সামনে আরও চিকিৎসা রয়েছে। তাই অর্থের প্রয়োজনও শেষ হয়নি।
সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের সাহায্য প্রয়োজন হলেও তারা প্রকাশ্যে সাহায্য চাইতে পারেন না। কেউ আত্মসম্মানের কারণে বলতে পারেন না, কেউ পরিচিত মানুষের কাছে যেতে সংকোচ বোধ করেন, আবার কেউ জানেনই না কোথা থেকে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের সংকট অনেক সময় আরও নীরব।
অত্যন্ত দরিদ্র হলে হয়তো মানুষ সহজেই বলতে পারেন, ‘আমাদের সাহায্য দরকার।’ আবার অত্যন্ত সচ্ছল হলে চিকিৎসার খরচ নিজেরাই বহন করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু মাঝখানে থাকা পরিবারগুলোর সংকট অনেক সময় চোখের আড়ালে থেকে যায়। শাহিন সুলতানার পরিবার সেই নীরব সংকটের একটি উদাহরণ।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার স্বামী, তিন সন্তানের একজন একজন স্কুলশিক্ষিকা মেয়ে, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ছেলে দশম শ্রেণির ছাত্র, নিজে একজন আদর্শ গৃহিণী, পরিবারটি হয়তো সমাজের চোখে একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু ক্যানসারের চিকিৎসা সেই সাধারণ জীবনের ওপর এমন একটি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে, যা একা সামলানো কঠিন।
তাই মেয়ের মঞ্চে ওঠা শুধু নিজের মায়ের জন্য অর্থ সংগ্রহের গল্প নয়। এটি সেইসব পরিবারের গল্পও, যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন আছে, কিন্তু সাহায্য চাওয়ার মতো কোনো সহজ জায়গা নেই। দর্শকের একটি টিকিট, একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।
চ্যারিটি মঞ্চনাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। এখানে দর্শক শুধু দর্শক থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন একটি উদ্যোগের অংশ। ৫০০ বা ১০০০ টাকার একটি টিকিট হয়তো একজন দর্শকের মাসিক ব্যয়ের তুলনায় খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু অনেক মানুষের ছোট ছোট সহযোগিতা একত্র হলে তা একটি পরিবারের জন্য বড় সহায়তা হয়ে উঠতে পারে।
আর সেই অর্থ যদি পৌঁছে যায় এমন একটি পরিবারের কাছে, যেখানে একজন মা ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন, তাহলে মঞ্চের আলো-আঁধারির বাইরে সেই নাটকের আরেকটি গল্প তৈরি হয়। সেই গল্পে থাকে একজন মায়ের সুস্থ হয়ে ওঠার আশা। থাকে একজন মেয়ের মাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। থাকে একটি পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে লড়াই। আর থাকে অচেনা কিছু মানুষের সহযোগিতার হাত।