Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা

দুই ভিন্ন গবেষণার পথে বাংলাদেশি দম্পতির অনুপ্রেরণার গল্প

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১১ পিএম

দুই ভিন্ন গবেষণার পথে বাংলাদেশি দম্পতির অনুপ্রেরণার গল্প

বিজ্ঞাপন

২০১৫ সালে বিয়ে। এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে দুজনের পথচলা একই দিকে—যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। তবে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেও তাঁদের পড়াশোনা ও গবেষণার বিষয় ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। একজনের আগ্রহ জননীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন নিয়ে; অন্যজনের গবেষণার বিষয় মানবদেহের কোষ, ফার্মাকোলজি ও ওষুধ তৈরির সম্ভাবনা। তাঁরা বাংলাদেশি দম্পতি আবির হাসান ও সিনায়াত মাহজাবীন। তাঁদের গল্প শুধু দাম্পত্য জীবনের নয়, বরং পরস্পরের স্বপ্নকে জায়গা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ।

সিনায়াত মাহজাবীন ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে স্নাতক সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে আবির হাসান পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে। পরে তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দুজনেরই লক্ষ্য ছিল দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের দক্ষতা যাচাই করা এবং গবেষণার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়া।

অক্সফোর্ডে যাওয়ার সুযোগ প্রথমে আসে আবিরের সামনে। তিনি জননীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ পান। একই সময়ে বিশ্বব্যাংকে কাজের প্রস্তাবও পেয়েছিলেন। পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি অক্সফোর্ডে ভর্তি এক বছর পিছিয়ে দেন। এই সময়েই স্ত্রী সিনায়াতকে অক্সফোর্ডে আবেদন করতে উৎসাহিত করেন।

সিনায়াতও তখন বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অক্সফোর্ডের পাশাপাশি তিনি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন এবং ডেনিশ সরকারের বৃত্তিসহ সেখানে পড়ার সুযোগও পান। শেষ পর্যন্ত তিনি অক্সফোর্ডকে বেছে নেন। এর অন্যতম কারণ ছিল—দুজন একই সময়ে একই শহরে থেকে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় শুরু করতে চেয়েছিলেন।

তবে তাঁদের অক্সফোর্ডযাত্রাকে শুধু দুজনের একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার গল্প হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না। সিনায়াতের ভাষ্যে, এই যাত্রার মধ্যে ছিল একে অপরের স্বপ্নকে জায়গা দেওয়া এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁকে পরস্পরকে সহযোগিতা করা। অর্থাৎ তাঁদের সম্পর্কের শক্তি ছিল একে অপরের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্নের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না দাঁড় করিয়ে পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়া।

অক্সফোর্ডে তাঁদের জীবন ছিল ব্যস্ততায় ভরা। আবিরের পড়াশোনা ও কাজের কেন্দ্র ছিল জননীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন। অন্যদিকে সিনায়াতের সময় কাটত ফার্মাকোলজি ও গবেষণাকে ঘিরে। দুজনের গবেষণার বিষয় এতটাই আলাদা ছিল যে একজনের কাজ আরেকজনের কাছে সব সময় সহজবোধ্য হওয়ার কথা নয়। তবুও দিনের শেষে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা, নতুন শেখা বিষয়, গবেষণার সমস্যা, পড়াশোনার চাপ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতেন।

এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্বাধীনতা। সিনায়াত জানিয়েছেন, তাঁরা কেউ কাউকে নিজের পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং দুজন নিজেদের পছন্দ ও আগ্রহ অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং একই সঙ্গে পাশে থেকেছেন। একজনের সাফল্য যেন অন্যজনের জন্য চাপ না হয়ে বরং অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে—তাঁদের পথচলায় এই মানসিকতাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

অক্সফোর্ডের অধ্যায় শেষ হওয়ার পরও তাঁদের একাডেমিক যাত্রা থেমে যায়নি। সিনায়াতের গবেষণার পথ তাঁকে নিয়ে যায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশে ফিরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় তাঁর গবেষণার প্রতি আগ্রহ আরও গভীর হয়। পরে ইউসুফ জামিল বৃত্তি নিয়ে ফার্মাকোলজিতে পিএইচডি করেন। তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মানবদেহের কোষে ক্যালসিয়ামের সংকেত আদান-প্রদান প্রক্রিয়া বোঝা।

মানবদেহের কোষগুলো পরস্পরের সঙ্গে বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করে এবং এসব সংকেত শরীরের নানা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। সেই ব্যবস্থায় ক্যালসিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এমন নতুন অণু খুঁজে বের করার সম্ভাবনা নিয়ে সিনায়াত কাজ করেছেন, যা ভবিষ্যতে ওষুধ আবিষ্কার ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় কাজে লাগতে পারে।

অন্যদিকে আবিরের গবেষণার কেন্দ্র বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। বিশেষ করে কীভাবে একটি দেশ রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন শিল্প ও নতুন রপ্তানি খাত তৈরি করতে পারে—সে বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিও তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পরবর্তীতে আবির আবার অক্সফোর্ডে ফিরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ে ডিফিল গবেষণা শুরু করেন। অন্যদিকে সিনায়াতও অক্সফোর্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকে গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যবস্থাপনার কাজে যুক্ত হয়েছেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যবস্থাপনায় কাজ করছেন।

তাঁদের একাডেমিক পথচলার আরেকটি বিশেষ দিক হলো—অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ, বিশ্বের দুই মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁদের শিক্ষাজীবনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের একটি পৃথক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ হাইকমিশন, অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ-সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ধাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দুজনই অক্সফোর্ডে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন; পরে সিনায়াত কেমব্রিজে পিএইচডি করেন এবং আবির অক্সফোর্ডে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ে ডিফিল শুরু করেন।

তবে তাঁদের কাছে এই অর্জনের অর্থ শুধু দুটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ অর্জন নয়। তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের জন্য কাজে লাগাতে চান। তাঁদের বার্তার মূল কথাও হলো—স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে পরিশ্রম করতে হবে এবং প্রত্যাখ্যান বা ব্যর্থতা এলে আবার চেষ্টা করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিতে সাফল্যের আসল অর্থ আরও বিস্তৃত। কোথায় পৌঁছানো গেল, তার পাশাপাশি সেই পথে কী শেখা হলো এবং অর্জিত জ্ঞান কীভাবে অন্যদের কাজে লাগানো যায়—সেটিও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আবির ও সিনায়াতের গল্প তাই একসঙ্গে দুটি বার্তা দেয়। প্রথমত, বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, জীবনসঙ্গী হওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত জীবনে পাশাপাশি থাকা নয়; একজন আরেকজনের স্বপ্নকে সম্মান করে, স্বাধীনতা দিয়ে এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করেও একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারেন।

একজনের গবেষণার বিষয় কোষ ও ওষুধ, অন্যজনের বিষয় অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় নীতি। পথ আলাদা হলেও তাঁদের লক্ষ্য এক জায়গায়—নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু করা। আর সেই কারণেই তাঁদের গল্পটি শুধু একটি দম্পতির সাফল্যের গল্প নয়; বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি স্বপ্ন দেখা, প্রস্তুতি নেওয়া এবং দীর্ঘ পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার একটি বাস্তব উদাহরণ।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার