পরের সরকারের জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:১১ পিএম
বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে যে অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও লুণ্ঠনের অভিযোগ ওঠে—তার প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় খেলাপি ঋণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি বাড়ছে এবং আয়যোগ্য সম্পদ কমে যাচ্ছে। সার্বিকভাবে খাতটির আয়ের প্রবণতাও নিম্নমুখী। বিশেষ করে লাগামহীন খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের প্রায় সব সূচকেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকেই ঝুঁকিতে ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে সঞ্চিত অনিয়মের দায় এখন অন্তর্বর্তী সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। তাদের মন্তব্য, আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারকে আরও জটিল ও চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত দিচ্ছে। এ অবস্থায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন—সবই কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট আরও তীব্র হলে ঋণ বিতরণ সক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং সার্বিক অর্থনীতিতে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বুধবার রাতে বলেন, কর্মসংস্থান বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে কর্মসংস্থান হবে না।
তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য বিপুল অঙ্কের টাকার দরকার। কিন্তু সেই টাকা তো বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশে পাচার করে নিয়ে গেছে। ফলে বেশির ভাগ ব্যাংকের অবস্থা এখন খুবই নাজুক। তাহলে বিনিয়োগের জন্য টাকা কোথা থেকে আসবে। মূলত এটিই হবে নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। কারণ ঋণ অবলোপন, নবায়ন ও আদালতে আটকে থাকা ঋণ এখানে হিসাব করা হয়নি। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপিকে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার করতে হবে। তা না হলে এর থেকে দেশ বের হতে পারবে না।
সূত্র জানায়, বর্তমানে মোট ব্যাংকের পঞ্চাশ ভাগ চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। খেলাপি ঋণের ফাঁদে পড়ে এই ব্যাংকগুলো এক রকম পঙ্গু হয়ে গেছে। এখানে এখন সমস্যা দুটি। একটি হলো আমানতকারীদের টাকা ফেরত কিভাবে দেওয়া হবে, দ্বিতীয়ত, আস্থাহীনতার কারণে নতুন আমানতকারীও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এ ব্যাংকগুলো দেশের বিনিয়োগ-অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখতে পারছে না।
অবশিষ্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে কিছু ব্যাংক এখনো সবল থাকলেও বাকিগুলোর অবস্থা মধ্যম মানের। ফলে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে পরিমাণ বিনিয়োগ চাহিদা তৈরি হবে বলে ধারণা করা যায়, তার ধারে কাছেও ব্যাংকে পুঁজি নেই। এছাড়া বিনিয়োগের সামনে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হলো উচ্চ সুদ। বর্তমানে ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তাহলে এই হারে সুদ দিয়ে কেউ ঋণ নিয়ে ব্যবসা করার সাহস দেখাবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে এটিও বড় দুর্যোগ তৈরি করবে। কারণ যারা এসব ব্যাংক থেকে উচ্চসুদে ঋণে নিচ্ছে বা নেবে তারাও এক সময় খেলাপি হয়ে যাবে। ফলে ব্যাংক অর্থনীতির এ রকম নানামুখী ভুলের ঝুঁকি আগামী নির্বাচিত সরকারকে বেশ ভোগাবে।
খেলাপি ঋণে রেকর্ড: বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত এক বছর ৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের ৯ মাসে বেড়েছে ২ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকেই সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এছাড়া অবলোপন করা ঋণ, বিশেষ বিবেচনায় নবায়ন করা ঋণসহ আরও মোটা অঙ্কের ঋণ রয়েছে, যেগুলো খেলাপির যোগ্য। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণের এই অঙ্ক রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অথচ সেই খেলাপি ঋণ এখন সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।