বিজ্ঞাপন
স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ার কারণ কী, আরও কমার সম্ভাবনা কতটুকু
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
বিজ্ঞাপন
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে ভরিপ্রতি স্বর্ণের গহনার দাম প্রায় তিন লাখ টাকার কাছাকাছি চলে যায়। সেটিই ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এরপর অনেকবার সমন্বয়ের পর ওঠানামা করলেও দাম মূলত কমেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে অবশ্য ক্রমান্বয়ে কমছেই স্বর্ণের দাম। গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম ভরিতে দুই হাজার টাকার বেশি কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুস।
নির্ধারিত নতুন দাম অনুযায়ী, এখন ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ভ্যাটসহ দুই লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকা। এছাড়া প্রতি ভরি ২১ ক্যারেট স্বর্ণ দুই লাখ নয় হাজার ৮৯৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট এক লাখ ৮০ হাজার ২৬৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এক লাখ ৪৭ হাজার ৩১৬ টাকা নির্ধারণ করেছে বাজুস।
স্বর্ণের এই দাম আরো কমবে নাকি আবার বেড়ে যেতে পারে; এগুলো নিয়ে অনুমান করার চেষ্টা করছেন অনেকেই। তবে, অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, স্বর্ণের দাম পূর্বানুমান করা বেশ কঠিন। কারণ এই বাজার খুবই নাজুক। প্রতিবেদন বিবিসি বাংলার।
বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং-এর চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন জানিয়েছেন, এই নিম্নগতি থাকলে আগামী কয়েকদিন হয়তো দেশে ভরি প্রতি স্বর্ণের দামও কম থাকতে পারে; তবে এটিও নিশ্চিত নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু এখন দাম কম থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই বেড়ে যেতে পারে বলে আশা করছেন আমিনুল শাহীন।
তিনি বলেন, ‘দাম কমবে কি না এটা কেউ বলতে পারবে না। তবে পিউর গোল্ডের ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট ও লোকাল মার্কেট একটু ডাউনওয়ার্ড ট্রেন্ড বা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আজ আন্তর্জাতিক বাজার খুব ওঠানামা করছে, এটার প্রভাব আমাদের এখানে কাল বা পরশু এসে হয়তো পড়বে। তখন হয়তো দাম কমতে পারে।’
বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাজার, চাহিদা, ডলারের মূল্য এরকম অনেকগুলো সূচকের ওপর নির্ভর করে দেশের বাজারে স্বর্ণের মূল্যের তারতম্য হয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখন স্বর্ণের দাম কমলেও হয়তো কিছুদিনের মধ্যে আবার বেড়ে যেতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘যুদ্ধটা যদি আরো তীব্র আকার ধারণ করে, যুদ্ধ বাড়া মানে বৈশ্বিক আর্থিক ঝুঁকিটা বেড়ে যায়। তাহলে কিন্তু আবার স্বর্ণের দাম বাড়বে। আমার ধারণা এই দাম কমাটা খুব একটা স্থায়ী হবে না।’
স্বর্ণের দাম কমার কারণ কী
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম লাখের ঘরে পৌঁছায়। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এ বছরের জানুয়ারিতে সেটি বেড়ে হয়েছিল দুই লাখ ৮৬ হাজার টাকা। জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ৯১ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাজুস। এর মধ্যে ৪৪ বার দাম বেড়েছে এবং ৪৬ বার কমেছে স্বর্ণের দাম। আর ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে একবার।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সোনার দাম নিম্নমুখী হয়। ২৮শে জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১ দশমিক ১ গ্রাম) সোনার দাম সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৩০৩ ডলারে ছিল। যেটি গত শুক্রবারে কমে চার হাজার ২৩৫ ডলার হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই বাজারটা চাপে রয়েছে। এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় তেল ও গ্যাসের দাম ছিল ঊর্ধ্বগতির। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ফীতিতে।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে অর্থনীতি যখন চাপে পড়ে তখন বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপটা বাড়ে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির কথাই বলছি।’ একইসঙ্গে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বর্তমানে স্বর্ণের দামের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন তিনি।
সুদের হার বাড়লে সাধারণত বন্ড ও মার্কিন ডলারের চাহিদা বাড়ে, ফলে স্বর্ণের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। কেননা স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ পাওয়া যায় না।
বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং এর চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধ বা এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে আগে স্বর্ণের দামে ঊর্ধ্বগতি থাকতো। যুদ্ধ চলমান থাকলেও এখন উল্টো কমে যাচ্ছে।
একইসঙ্গে, চীনা ব্যাংকগুলোর নেয়া একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত স্বর্ণের দাম কমার পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন আমিনুল শাহীন। তিনি বলেন, ‘চাইনিজ ব্যাংকগুলো বলছে, পেপার ট্রেডিং গোল্ড তারা রাখতে দেবে না। সবাইকে ২৬শে জুলাইয়ের মধ্যে এগুলো এনক্যাশ বা টাকায় রূপান্তর করতে হবে। একইসময়ে এতগুলো জিনিস সেল হওয়ায় তার প্রেসার অনেকটা ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে পড়ছে- এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা।’
উল্লেখ্য, পেপার ট্রেডিং গোল্ড বলতে বোঝায়, শেয়ার বা কমোডিটি মার্কেটে যেখানে স্বর্ণ, তেল ইত্যাদির কেনা-বেচা করা হয়, সেখানে একটি ঝুঁকিমুক্ত প্রক্রিয়া হলো পেপার ট্রেডিং গোল্ড।অর্থাৎ, আসল সোনা হাতে না রেখে, কাগজের ডকুমেন্ট বা ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সোনার মালিকানা বা মূল্যের ওপর বিনিয়োগ করাকে বোঝায়।
স্বর্ণের দাম পূর্বানুমান করে এরকম কয়েকটি আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটে দাম কবে নাকি বাড়বে এ বিষয়ে অনুমান করা হয়েছে বলে জানান আমিনুল শাহীন। তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ফেমাস বেশ কয়েকটা ওয়েবসাইটে যারা প্রেডিক্ট করে তাদের বক্তব্য হলো, ২০২৬ সালের মধ্যে স্বর্ণের দাম আবার হয়তোবা ৫৮০০ বা ৯০০ বা ছয় হাজার ডলার পার আউন্স হতে পারে। আমরা আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যেই এটা আরেকবার বেড়ে যেতে পারে। দামটা বাড়বে। যে নিম্নমুখী প্রবণতা, এর একটা টাইম থাকে।’