বিজ্ঞাপন
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে লোকসান ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
বিজ্ঞাপন
গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়কৃত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। লোকসানের এই হিসাব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভর্তুকি ও উন্নয়ন সহায়তাসহ সরকারের মোট নিট আর্থিক সহায়তা বেড়ে প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা দেশের জিডিপির ১.৭ শতাংশের সমান। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে (এসওই) সরকারি কোষাগার থেকে এই ব্যয়ের প্রভাব অন্যতম বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আয় কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়া এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থা এখন ‘অসহনীয়’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান লোকসানের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মদক্ষতা ও আর্থিক ঝুঁকি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফল গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার একটি হোটেলে প্রকাশ করা হয়। এ বিষয়ে অবহিতকরণ কর্মশালার আয়োজন করে বিশ্বব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বিশ্বব্যাংক নিয়োজিত পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) অব বাংলাদেশ এ গবেষণা পরিচালনা করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি ও বিদ্যুত্ খাতেই সবচেয়ে বেশি লোকসান হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) একাই ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান করেছে। উচ্চ বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যয়, বেসরকারি বিদ্যুেকন্দ্রগুলোকে উচ্চ ক্ষমতা ভাড়া পরিশোধ এবং উত্পাদন ব্যয়ের তুলনায় কম ট্যারিফ নির্ধারণকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, রাজনৈতিক প্রভাবিত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, বিতর্কিত বিদ্যুত্ ক্রয়চুক্তি এবং দুর্বল করপোরেট সুশাসন খাতটির আর্থিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বড় লোকসানি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরো রয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ এবং সার, চিনি ও পাট খাতের কয়েকটি উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক থাকলেও অনেক উত্পাদনমুখী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিক লোকসান বহন করছে।
কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশ্বব্যাংকের লিড গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট সুরাইয়া জান্নাত কর্মশালার প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাসান খালেদ ফয়সাল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সামষ্টিক আর্থিক পরিস্থিতির ওপর উপস্থাপনা দেন। বিশ্বব্যাংকের লিড পাবলিক সেক্টর স্পেশালিস্ট অঁরি ফোরতাঁ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট ইমানুয়েল ফ্রাংক স্টেইনহিলপার বৈশ্বিক প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করেন। পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশীদ আলম বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মদক্ষতা ও ঝুঁকি বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
গবেষণায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় গভীর সুশাসন সংকটের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। খণ্ডিত আইন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবকে দুর্বল পারফরম্যান্সের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনাও করেছে। এতে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদে মুনাফার হার (রিটার্ন অন অ্যাসেটস) ছিল ঋণাত্মক ৫.২ শতাংশ। বিপরীতে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এ হার ছিল ইতিবাচক ৯.৭ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে প্রায় ১১.৯ শতাংশ। গবেষণায় বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ১০ শতাংশ সম্পদে মুনাফা অর্জন করতে পারে এবং ভর্তুকিনির্ভরতা কমাতে সক্ষম হয়, তাহলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত ১.২ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি আর্থিক সম্পদ সংগ্রহ করতে পারবে।
সংকট উত্তরণে গবেষণা প্রতিবেদনে বাণিজ্যিকভাবে সক্ষম রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, স্বাধীন ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন, আর্থিক তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা জোরদার, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং একচেটিয়া খাতগুলোতে ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে লোকসান করা এবং কৌশলগত জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন নেই এমন প্রতিষ্ঠান ধাপে ধাপে বেসরকারিকরণ বা বন্ধ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।