বিজ্ঞাপন
১০ হাজার কোটি টাকার নিট মুনাফা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের
অর্থনৈতিক মন্দা ও সংকটের পাঁচ বছর
জাগো বাংলা প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম
বিজ্ঞাপন
দেশের অর্থনীতি গত পাঁচ বছর নানা সংকট ও মন্দার চাপে ঘুরপাক খাচ্ছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ব্যাংক খাতের বড় একটি অংশ।
বর্তমানে দেশের প্রায় অর্ধেক ব্যাংকই মুনাফা করতে হিমশিম খাচ্ছে। সংকটময় এ পরিস্থিতির মধ্যেও ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড মুনাফা করে চলছে বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এ ব্যাংকটি কেবল গত পাঁচ বছরই বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। সবশেষ ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা, যা দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড মাত্র ১৮টি শাখা ও একটি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো নিয়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত বছর শেষে ব্যাংকটির মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকায়। বিতরণকৃত ঋণস্থিতি ছিল ৩০ হাজার ৪২৩ কোটি টাকারও কম। এত ছোট পোর্টফোলিও নিয়েও দেশের সবচেয়ে বেশি নিট মুনাফা করে আসছে বহুজাতিক ব্যাংকটি।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের তথ্যমতে, ২০২০ সালের পর থেকেই ব্যাংকটির নিট মুনাফায় উল্লম্ফন চলছে। কভিড-১৯ সৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগের মধ্যে ২০২১ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের নিট মুনাফা ছিল ৭৫৮ কোটি টাকা। এরপর ২০২২ সালে এ মুনাফা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকায় ঠেকে। আর ২০২৩ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা বেড়ে ২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে এসে এ মুনাফা ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর ব্যাংকটির নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। এরপর ২০২৫ সালেও ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ। সে হিসাবে গত পাঁচ বছরে ব্যাংকটি বাংলাদেশ থেকে ৯ হাজার ৬১৩ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে।
বহুজাতিক ব্যাংকটির বাংলাদেশ অফিস গতকাল ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ ও সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবেই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মুনাফা এতটা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকটির মুনাফার প্রাথমিক ভিত গড়ে দিচ্ছে সর্বনিম্ন তহবিল সংগ্রহ ব্যয়। অর্থাৎ আমানত সংগ্রহে ব্যাংকটিকে তেমন কোনো অর্থই ব্যয় করতে হচ্ছে না। যেমন ২০২৫ সালে ৪০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার আমানতের বিপরীতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সুদ ব্যয় ছিল মাত্র ২৮৮ কোটি টাকা। কিন্তু একই সময়ে মাত্র ৩০ হাজার ৪২৩ কোটি টাকার ঋণস্থিতির বিপরীতে গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাংকটি ৩ হাজার ১৯৮ কোটি টাকার সুদ আয় করেছে। সে হিসাবে সুদ খাত থেকে গত বছর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের নিট আয় ছিল ২ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। এর বাইরে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডসহ বিনিয়োগ থেকে ১ হাজার ৭৯২ কোটি এবং কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ থেকে ১ হাজার ৫ কোটি টাকা আয় করেছে ব্যাংকটি। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মোট পরিচালন আয় ছিল ৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাসের এজাজ বিজয় বলেন, ‘ব্যাংকিং মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যবসা। আর চ্যালেঞ্জিং সময়েই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রকৃত সক্ষমতা পরীক্ষিত হয়। বাংলাদেশে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে গত ১২০ বছর। এ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা বাজার-সমঝোতা, বৈশ্বিক জ্ঞান এবং বিশ্বমানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অনুশীলন—সব মিলিয়ে প্রতিকূলতার মধ্যেও ব্যাংককে শক্তিশালী পারফরম্যান্স দিতে সহায়তা করেছে। আমাদের ব্যাংকের মূলধন এখন বাজারে সর্বোচ্চ, তারল্য অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সম্পদের গুণগত মানও অসাধারণ। আমরা অসাধারণ সব ক্লায়েন্ট, সহকর্মী এবং স্টেকহোল্ডারদের সমর্থনে ধন্য।’
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মন্দা ও সংকটের মধ্যেও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মুনাফার বিষয়ে নাসের এজাজ বিজয় বলেন, ‘অসংখ্য নেতিবাচক সংবাদ ও কঠিন বাজার পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের ধারাবাহিক শক্তিশালী পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে সঠিকভাবে পরিচালিত হলে বাংলাদেশে ব্যাংকগুলো অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবসা করতে পারে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ এক্ষেত্রে একমাত্র উদাহরণ নয়। আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, সুশাসিত ও দক্ষভাবে পরিচালিত স্থানীয় ব্যাংকগুলোর অনেকেও রেকর্ড পারফরম্যান্সসহ অসাধারণ ফলাফল প্রকাশ করেছে। এটি দেশের ভাবমূর্তি ও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বার্তা।’
দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে তিন বছরের বেশি সময় ধরে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে নীতি সুদহার ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাবে দেশের ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহার ৯ থেকে বেড়ে ১৪-১৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। একইভাবে বেড়েছে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহারও। চার বছর আগে যে বিল-বন্ডের সুদহার ছিল ২ থেকে ৫ শতাংশ, সেটিই গত দুই বছরে ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদে কেনাবেচা হচ্ছে। আর অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ব্যাংকগুলোও বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি উৎসাহী হয়েছে। যে ব্যাংকগুলো সরকারি বিল-বন্ডে যত বেশি বিনিয়োগ করেছে, সে ব্যাংকের মুনাফাও তত বেশি ফুলেফেঁপে উঠেছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত বছর শেষে সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকটির বিনিয়োগ ছিল ১৭ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। এ বিনিয়োগ থেকে ১ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা আয় করেছে ব্যাংকটি।
তারল্য সংকটের কারণে দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলো এখন ১২ শতাংশেরও বেশি সুদে মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করছে। আর অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যাংকগুলোর মেয়াদি আমানতের সুদহারও ৮ শতাংশের বেশি। কিন্তু এক্ষেত্রে একেবারেই ব্যতিক্রম স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সঞ্চয়ী হিসাবের বিপরীতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড দশমিক শূন্য ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পরিশোধ করে। আর তিন মাস মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির সুদহার দশমিক শূন্য ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ। আমানতের মেয়াদ বেশি হলে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে গ্রাহকদের বেশি সুদহার দেয়া হয়। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডে জমা থাকা ছয় মাসের বেশি মেয়াদি আমানতের সুদহার মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ।
সর্বনিম্ন সুদে তহবিল সংগ্রহের বিপরীতে উচ্চ সুদের ঋণ বিতরণের কারণে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের স্প্রেড (আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান) এখন দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, এ মুহূর্তে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের স্প্রেড ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আমানতের গড় সুদহার দশমিক ৬৩ শতাংশ হলেও ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের গড় সুদ ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
এদিকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পর বাংলাদেশে কার্যরত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিট মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। বেসরকারি এ ব্যাংকটি গত বছর রেকর্ড ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি সিটি ব্যাংক পিএলসি। গত বছর তাদের নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। আর সরকারি খাতের সোনালী ব্যাংক পিএলসি গত বছর ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকার নিট মুনাফা দেখিয়েছে। পূবালী ব্যাংক নিট মুনাফা করেছে ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। দেশের এ চারটি ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংক নিট মুনাফার দিক থেকে হাজার কোটি টাকার ক্লাব স্পর্শ করতে পারেনি। ৯০০ কোটি টাকার বেশি নিট মুনাফা করে এক্ষেত্রে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে ডাচ্-বাংলা, প্রাইম ও ইস্টার্ন ব্যাংক।