Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

সারাদেশ

টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, জানা গেল কারণ

Icon

জাগো বাংলা ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, জানা গেল কারণ

বিজ্ঞাপন

কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে নিচতলার একটি ফ্রিজে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও তদন্ত কমিটি। পরে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। রিসোর্টের গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।

গত ১৭ অক্টোবর সকালে এ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। আগুনে পুড়ে যায় রিসোর্টের বড় অংশ। ঘটনার পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা, নির্মাণকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও রিসোর্টে কী ধরনের দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল, সেগুলো সেখানে রাখার অনুমতি ছিল কি না এবং অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ঘটনার পর থেকে রিসোর্টের মালিক ও মামলার প্রধান আসামি মো. তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক রয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তিনি বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করছেন। আরেক মালিক নেওয়াজ মোরশেদসহ অন্যরাও আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো শুনানি হয়নি।

ফ্রিজ থেকে আগুন, পরে বিস্ফোরণ

উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, গ্রেফতার জাহিদ হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টের নিচতলার একটি ফ্রিজে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে।

ওসি জানান, রিসোর্টের গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ছিল। তীব্র বাতাস ও কাঠের অবকাঠামোর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে গুদামে কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ বলেন, আগুনের সূত্রপাত নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত কারণ জানতে আরও সময় লাগবে। তদন্তের মাধ্যমে আগুন লাগার কারণ, রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত এবং পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আগুনের কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

প্রায় ২০ শতক জমির ওপর নির্মিত রিসোর্টটির কক্ষের মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়ির বড় অংশ ছিল কাঠের। সড়কের দিকে গাছের খুঁটির ওপর রেস্তোরাঁর বর্ধিত অংশও তৈরি করা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডে এসব অংশের বড় অংশ পুড়ে যায়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে কাঠের অবকাঠামোর ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়েও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুসন্ধান করছেন।

ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও তিন সংস্থার অনুমোদন ছিল না

রিসোর্টটি পরিচালনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়েছিল। তবে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল না বলে জানা গেছে। অগ্নিকাণ্ডের পর এসব অনুমোদন না থাকার বিষয়টি সামনে আসে।

পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও অনুমোদনের শর্ত কতটা মানা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম জানান, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নির্ধারিত ফি নিয়ে টুপটুপ রিসোর্টের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। গত ২২ জুলাই রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়ার নামে লাইসেন্সটি ইস্যু করা হয়। এতে তার ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মীরপাড়া। লাইসেন্সটির মেয়াদ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। ফি, মূল্য সংযোজন কর ও বাণিজ্যিক কর মিলিয়ে আদায় করা হয় দুই হাজার টাকা।

তবে ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই রিসোর্ট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন সম্পন্ন হয় না। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনুমোদন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করা হয়েছিল কি না, তা আলাদাভাবে যাচাইয়ের বিষয়। টুপটুপ রিসোর্টের ক্ষেত্রে এসব অনুমোদন না থাকার তথ্য সামনে আসায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম তদারকির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগুনের কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি রিসোর্টে দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনা, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা ছিল কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এসব বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজ নিয়ে স্বজন ও পুলিশের ভিন্ন হিসাব

অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে কতজন পর্যটক ছিলেন, তা নিয়ে স্বজন ও পুলিশের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। স্বজনদের ভাষ্য, ১৬ অক্টোবর রাতে নারী ও শিশুসহ ২১ জন পর্যটক রিসোর্টে ছিলেন। পরদিন ভোরে আইরিন জাহান ও ইসরাত জাহান সৈকতে বেড়াতে গেলে রিসোর্টে ১৯ জন অবস্থান করছিলেন।

স্বজনদের হিসাবে, তাদের মধ্যে ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, ছয়জন আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন এবং দুজন লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। তাদের দাবি, আরও একজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ কারণে হতাহতের সংখ্যা ও নিখোঁজের বিষয়টি নিয়ে স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

তবে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেফতার সহকারী ব্যবস্থাপকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগুনের সময় আটটি কক্ষে ১৯ জন অতিথি ছিলেন। তাদের মধ্যে ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সাতজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। এই ১৯ জনের বাইরে কেউ নিখোঁজ রয়েছেন, এমন তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে লিখিত দাবিও আসেনি।

জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, ১০টি লাশ উদ্ধারের পর আরও একজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে আসে। পরে ফায়ার সার্ভিস আবার তল্লাশি চালালেও কোনো লাশ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার