বিজ্ঞাপন
মমেকে আগুন: ‘পদদলিত হয়ে ছয়জন মারা যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি’
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
বিজ্ঞাপন
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে তথ্য ছড়ালেও বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, আগুনের পর পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে নিহতদের স্বজনদের দাবি, আতঙ্কে সিঁড়িতে হুড়োহুড়ির সময় পড়ে অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালের রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। অনেকে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। এসময় হুড়োহুড়ি ও ভিড়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছয়জন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ূন কবীর জানান, ‘ছয়জন পদদলিত হয়ে মারা যাওয়ার কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘হাসপাতালের রেজিস্ট্রার, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক-নার্স, ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ছয়জনের পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর তালিকায় থাকা একজনকে জীবিত অবস্থায় চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।’
তিনি জানান, তালিকায় থাকা বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের স্বজনরা জানিয়েছেন। অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আগুনের ঘটনায় কেউ পদদলিত হয়ে মারা গেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে নিহত দুজনের স্বজনরা দাবি করেছেন, আগুনের পর আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হুড়োহুড়িতে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত কুলসুম আক্তার (৩৫) তারাকান্দা উপজেলার বালিখা এলাকার শহিদুল ইসলামের স্ত্রী। তার ১২ বছর বয়সি ছেলে স্বাধীন মমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিল।
স্বজনদের ভাষ্য, আগুন লাগার পর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কুলসুম সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। এসময় হুড়োহুড়ির মধ্যে তিনি পড়ে যান। পরে তাকে উদ্ধার করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয় বলে স্বজনরা দাবি করেছেন।
অপর নিহত শাহজাহান মনির (৪৫) ফুলপুর উপজেলার রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি যক্ষ্মার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
তার ছেলে পলাশ মোল্লার দাবি, আগুনের সময় সিঁড়ি দিয়ে নামার পথে পেছন থেকে ধাক্কা লেগে তার বাবা পড়ে যান। এসময় তার মা ও খালাও আহত হন। পরে শাহজাহানকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে হাসপাতালের তালিকায় জাহানারা আক্তার নামে একজনকে মৃত দেখানো হলেও তিনি জীবিত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ। তিনি জানান, জাহানারা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
অগ্নিকাণ্ডের সময় হাসপাতালের সিঁড়ি ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের দুটি সিঁড়ির মধ্যে একটি বন্ধ থাকায় আগুনের সময় রোগী ও স্বজনদের একটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়। এতে সেখানে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয় এবং আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখার কথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে সিঁড়ি বন্ধ রাখা যৌক্তিক ছিল কি না এবং এতে কোনো অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটে আগুন লাগার খবর পেয়ে প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে ১০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে এবং প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, লিফটের কন্ট্রোল রুমে থাকা কন্ট্রোলার মেশিনের বোর্ডে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অথবা অতিরিক্ত উত্তাপ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আগুনের পর ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়া এবং পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা নাকচ করার ঘটনায় পুরো বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রশাসন বলছে, পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে দুজনের স্বজন সরাসরি দাবি করছেন, আগুনের সময় সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি ও পড়ে যাওয়ার কারণেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।