বিজ্ঞাপন
সাভারে শিশু বলাৎকার মামলার ৮ দিন পর মাদরাসায় অভিযান, গ্রেফতার নেই
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
বিজ্ঞাপন
ঢাকার সাভারে মাদরাসা ছাত্রকে ছাত্র ও শিক্ষক কর্তৃক বলাৎকারের ঘটনায় মামলার আট দিন পর মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ নামে সেই মাদরাসায় অভিযান চালিয়েছে সাভার মডেল থানা পুলিশ। তবে অভিযানে মামলার ১০ আসামির কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে উপজেলার পূর্ব শাহীবাগ এলাকায় মাদরাসাটিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পুলিশ জানায়, সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি অপারেশন) আব্দুস সবুরের নেতৃত্বে পুলিশের দুটি টিম মাদরাসায় যায়। মাদরাসার মক্তব শাখায় শিক্ষার্থী ও উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন ও অভিযোগ ওঠা ছাত্রদের নথিপত্র যাচাই করেন। শিক্ষকদের বিষয়ে খোঁজখবর নেন। এ সময় অভিযুক্ত ছাত্র ও শিক্ষকরা পলাতক রয়েছেন বলে সেখানে উপস্থিতরা জানান। দীর্ঘ সময় সেখানে উপস্থিত শেষে তারা ফিরে আসেন।
তাৎক্ষণিক অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা ঘটনার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কথা বলবেন জানিয়ে অভিযানের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে বিকেলে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপারেশন ট্রাফিক উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রথমে ভুক্তভোগী পরিবার আমাদের থানায় আসেনি, এই বিষয়টি আপনাদের স্পষ্ট করা দরকার। সেই পরিবার আদালতে যখন বিষয়টি নিয়ে যান, তখন আদালতের নির্দেশে সাভার মডেল থানায় আমরা মামলাটি রুজু করা হয়।
তিনি বলেন, মামলা রুজু করার পরপরই আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য আমাদের একাধিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। একইসঙ্গে আমরা আসামিদের গ্রেফতার করার জন্য অভিযান পরিচালনা করি। কিন্তু আজকে আসামিদের পাওয়া যায়নি, তারা পলাতক রয়েছে। তবে তাদের গ্রেফতার করার জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে অভিযান অব্যাহত আছে। আমরা ইতোমধ্যে আসামিদের গ্রেফতার করার জন্য অভিযান পরিচালনা করেছি। আসামিরা যেহেতু পলাতক রয়েছে, তাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি। খুব দ্রুত আমরা তাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হবো।
এদিকে পুলিশের অভিযানে এখনও আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় মামলার বাদি ভুক্তভোগী শিশুর বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সাভার মডেল থানায় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমার ছেলেকে দীর্ঘ ছয় মাস ৬-৭ জন ছাত্র ও শিক্ষক মিলে বলাৎকার করেছে। আমার ছেলে অসুস্থ। আমি এ ঘটনায় মাদরাসার মোহতামিমের জিয়া বিন কাশেমের কাছেও বিচার দিয়েছিলাম। তিনি অপরাধীদের আইনের হাতে তুলে না দিয়ে পালাতে সাহায্য করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি আমাকে চুপ থাকতে বলেন ও পরবর্তীতে হুমকিও দেন। এ ঘটনায় চিকিৎসা শেষে আমার ছেলেকে নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হই।
ভুক্তভোগীর বাবা আরও বলেন, আদালত সাভার থানাকে মামলা নেওয়ার আদেশ দেন। মামলায় মাদরাসার মোহতামিমসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। দীর্ঘ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও পুলিশ একজন আসামিও গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশ শুরুতেই অভিযান চালালে সব আসামি গ্রেফতার করতে পারতো। পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে এমনও বলা হয়েছে, মামলার একজন আসামি সাদপন্থি নেতা হওয়ায় ওই মাদরাসায় অভিযান চালানো যাবে না। চালালে উল্টো থানায় আক্রমণ হতে পারে। দীর্ঘ দিন পরে হলেও পুলিশ আজ মাদরাসায় অভিযান চালিয়েছে। কাউকে আটক করতে পারেনি। পুলিশের কাছে আমার দাবি, অতি দ্রুত মামলার সব আসামি গ্রেফতার করা হোক ও আইনের আওতায় আনা হোক।
যা বলছে মাদরাসা ছাত্র ও কর্তৃপক্ষ
মাদরাসার একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ঘটনায় আমরা প্রকৃত দোষীর যথাযথ বিচার চাই। তবে আমাদের দাবি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কোনো ছাত্র ও শিক্ষককে যেন হয়রানি না করা হয়।
তবে যেসব ছাত্রের নাম মামলায় দেওয়া হয়েছে প্রত্যেকের বয়স ১৩ ও এর নিচে বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
মাদরাসাটির বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষক লোকমান বলেন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা আমাদের সঙ্গে তাবলিগ জামাত করতেন। ১০-১২ দিন আগে তিনি আমাদের এখানে এসে হাঁকডাক করে হুজুরকে (মোহতামিম) ডাকতে থাকেন। হুজুর নিচে এসে দেখতে পান তিনি তাকে গালিগালাজ করছেন, তার হাতে দেশিয় অস্ত্র। এ সময় ওই শিক্ষার্থীর বাবা বলেন- ‘আমার ছেলের সঙ্গে এ ধরনের খারাপ কাজ হয়েছে। যারা করেছে, যে হুজুররা করেছে, আমি তাদের জবাই দেবো।’ এতে হুজুর বিব্রত হন। পরবর্তীতে যে ওস্তাদ এবং যে ছাত্রদের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা ভয়ে সেদিনই মাদরাসা ছেড়ে চলে যায়।
তিনি বলেন, বড় হুজুর একজন মাদরাসার প্রধান, আমাদের তাবলিগের মুরব্বি। তিনি আন্তর্জাতিক একজন ব্যক্তিত্বও। তিনি বিষয়টির বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন সেদিনই। আমাদের বক্তব্য, কেউ যদি অন্যায়-অপরাধ করে থাকেন, তাহলে তদন্ত করা হোক। তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হোক। কেউ যদি এ ধরনের কাজ করে থাকে, তার পরীক্ষা করা হোক, তার আলামত পরীক্ষা করা হোক। এখানে অভিযোগের বিষয়টিও আপনারা যদি খতিয়ে দেখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন, সাত-আট বছর বয়সিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। পাঁচজন ছাত্র। এই শিশুদের অবস্থা কী হবে? কেউ যদি গুনাহ বা অন্যায় করে থাকে, সেটা আমরা সমর্থন করি না। আপনারা ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে যেমন প্রশ্ন করছেন, একজন অভিভাবক দেশিয় অস্ত্র নিয়ে এলেন, এ ব্যাপারে পুলিশকে ইনফর্ম করলেন না কেন, এটিও একটি বিষয়।
লোকমান বলেন, আমরা তাবলিগের সাথী হিসেবে তার সঙ্গে বসে বিষয়টি নিয়ে একটা সমাধান করতে চেয়েছিলাম। কয়েকবার তার সঙ্গে বসে কীভাবে বিষয়টি সমাধান করা যায়, তা নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু তিনি বিষয়টি সেভাবে গ্রহণ করেননি। আমরা বলেছি, তিনি থানায় মামলা করবেন, ঠিক আছে, তাকে সাপোর্ট দেওয়া হবে। গত কয়েকদিন ধরে সাংবাদিক আসছেন। তারা যেসব তথ্য চাইছেন, আমরা সেভাবেই তথ্য দিচ্ছি। আমরা চাই, প্রকৃত অপরাধী কে, সেটা উদঘাটিত হোক।
মামলায় যা বলা হয়েছে
মাদরাসা পড়ুয়া সাত বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের ঘটনায় সরাসরি পাঁচ শিক্ষার্থী ও পাঁচ শিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করেন ভুক্তভোগীর বাবা। গত ২৬ আগস্ট সাভার মডেল থানায় মামলাটি রুজু করে।
শিশুটির বাবা জানান, তার সন্তান ওই মাদরাসায় আবাসিক থেকে পড়াশোনা করে। সম্প্রতি সে বাড়ি ফিরে মনমরা হয়ে পড়ে ও মাদরাসায় ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়। একপর্যায়ে মাদরাসার অপর শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছে তিনি জানতে পারেন, সেখানে শিশু শিক্ষার্থীদের বলাৎকারের অভিযোগ রয়েছে এবং কয়েক দিন আগে এ নিয়ে মাদরাসায় বিচারও হয়েছে।
এরপর তিনি ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। গত ১৪ আগস্ট শিশুটি পরিবারের সদস্যদের কাছে তাকে বলাৎকারের শিকার হওয়ার কথা জানায় বলে দাবি করেন তার বাবা।
তার অভিযোগ, চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তার ছেলেকে বলাৎকার করে।
এরপর তিনি মাদরাসার পরিচালক জিয়া বিন কাশেমের কাছে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেন। অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরদিন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকতে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিচিত এক চিকিৎসকের পরামর্শ নেন তার বাবা। ওই চিকিৎসক শিশুটিকে পরীক্ষা করে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। গত ১৮ আগস্ট শিশুটিকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসকেরা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেওয়ার পরামর্শ দেন। ওই দিনই শিশুটিকে ওসিসিতে নেওয়া হয় এবং সেখানে চার দিন ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানান তার বাবা।
পরে পরিচিত এক আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। আদালত শিশুটির জবানবন্দি গ্রহণ করে সাভার মডেল থানাকে মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপর গত ২৬ আগস্ট থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। তবে এখনও কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন শিশুটির বাবা।
মামলায় পাঁচ শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরাসরি বলাৎকারের অভিযোগ আনা হয়। বাকি চারজনের বিরুদ্ধে বলৎকারে সহযোগিতা, অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করা, ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ২৬ আগস্ট সাভার মডেল থানায় মামলাটি রুজু করে।