বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
‘ম্যাম, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় আমি কত পেয়েছি?’ পরীক্ষা শেষে শিক্ষকের কাছে জানতে চেয়েছিল নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সায়েদ মুনিফ আহমেদ শান।
কে জানত, এটিই হবে শিক্ষকের কাছে তার শেষ প্রশ্নগুলোর একটি। শানের খাতা এখনো শিক্ষকের কাছে পড়ে আছে, নম্বর দেওয়া হয়নি। আর শানও ফিরে এসে জানতে চাইবে না সেই নম্বর।
চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শানের বয়স ১৫ বছর। শনিবার (১৫ আগস্ট) সকালে কোচিংয়ের পরীক্ষায় অংশ নিতে বাসা থেকে বের হয়ে চার বন্ধুর সঙ্গে পতেঙ্গা সৈকতে যায় সে। সেখানে সাগরে নামার পর স্রোতের টানে ভেসে যায় বলে পুলিশকে জানিয়েছে তার সঙ্গে থাকা বন্ধুরা।
পরে শনিবারই পতেঙ্গা সৈকত এলাকা থেকে শানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে পরিবার তার মৃত্যুর খবর জানতে পারে সোমবার সন্ধ্যায়।
শানের জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষার শিক্ষক সুমাইয়া বেগম মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তার প্রিয় শিক্ষার্থীর স্মৃতিচারণ করেন।
সুমাইয়া বেগম লিখেছেন, ১০ আগস্ট শান জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষা দিয়েছিল। পরীক্ষা শেষে খাতাও জমা দেয়। পরদিন সে শিক্ষকের কাছে জানতে চায়, ‘ম্যাম, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় আমি কত পেয়েছি?’
শিক্ষক জানান, সাধারণত পরীক্ষা দেওয়ার পর শান নিজের নম্বর জানতে চাইত না। এবার সে বলেছিল, ‘ম্যাম, আপনি বলছেন যে এবার আমি বাসায় ভালো করে পড়ছি, পরীক্ষায়ও লিখছি। তাই নম্বরটা জানতে চাইছি। নম্বর জানলে খুশি হতাম।’
অসুস্থ থাকায় সেদিন শানের খাতা দেখতে পারেননি সুমাইয়া বেগম। পরে খাতা দেখে নম্বর জানাবেন এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সুযোগ আর হয়নি।
শানের শিক্ষক লিখেছেন, ‘সেই খাতা এখনো আমার কাছে পড়ে আছে। নম্বর দেওয়া হয়নি। শানও আর এসে জিজ্ঞেস করবে না- ম্যাম, আমি কত পেয়েছি?’
বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলে পড়াশোনা করত শান। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর থেকে তার রোল নম্বর ছিল ১। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও তার আগ্রহ ছিল। বিশেষ করে ফুটবল খেলতে পছন্দ করত সে।
চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল জলিল বলেন, শান খুবই নম্র ও ভদ্র শিক্ষার্থী ছিল। পড়াশোনায় ভালো করার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও তার অনেক আগ্রহ ছিল। তার মৃত্যুতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মর্মাহত।
শানের স্মরণে বুধবার বিদ্যালয়ে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিদ্যালয়ের সবাই অংশ নেবেন।
শান নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। এর মধ্যেই অপহরণের কথা বলে পরিবারের কাছে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবার থেকে টাকা পাঠানো হয়।
শানের চাচা গোফরান উদ্দিন বলেন, শানের মামার বিকাশ নম্বর থেকে টাকা পাঠানো হয়েছে। প্রথমে ষোলশহর স্টেশনে আসতে বলা হয়েছিল। পুলিশ সেখানে গেলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে অন্য একটি নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হয়। সেই নম্বরেও টাকা পাঠানো হয়েছে। পরে জানা যায়, নম্বরটি লোহাগাড়া এলাকার এক ব্যক্তির নামে। এসব তথ্য পুলিশকে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
শানের পরিবারের করা মামলায় তার চার সহপাঠীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ সুলতান আহসান উদ্দীন বলেন, শনিবার শান চার বন্ধুর সঙ্গে পতেঙ্গায় ঘুরতে গিয়েছিল। সেখানে পানিতে ভেসে যাওয়ার পর বন্ধুরা ভয় পেয়ে বিষয়টি কাউকে জানায়নি বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করা হয়েছে। অপহরণের কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় চার কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।