বিজ্ঞাপন
নিহত শিক্ষিকার ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে অবাক ময়নাতদন্তকারীরা
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম
বিজ্ঞাপন
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসমা সাদিয়া রুনার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো কিছু দিয়ে ২০টির বেশি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন ময়নাতদন্তকারীরা। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে এ কথা জানান চিকিৎসকরা। এরপর পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করে পুলিশ। পরে পরিবারের সদস্যরা লাশ কুষ্টিয়া শহরের বাসায় নিয়ে যান।
লাশের ময়নাতদন্ত করেন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন চিকিৎসা কর্মকর্তা রুমন রহমান ও সুমাইয়া। আরএমও হোসেন ইমাম বলেন, ‘নিহত শিক্ষকের গলার নিচে সজোরে আঘাত করা হয়েছে। এতে গভীর ক্ষত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতেই মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বুক, পেট, হাত-পাসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০টি আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। তাতে মনে হয়েছে, ঘটনার সময় ধস্তাধস্তি হয়েছে। বাঁচার জন্য শিক্ষক হাত দিয়ে ঠেকাতে গেছেন, এতে হাতেও আঘাত লেগেছে। যেভাবে আঘাত করা, তা খুবই ক্ষোভ ও আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ মনে হচ্ছে।’
গতকাল বুধবার বিকাল ৪টার দিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা নিহত হন। একই সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
থানায় চার জনের নামে এজাহার
নিহত শিক্ষকের স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান হত্যার ঘটনায় থানায় এজাহার জমা দিয়েছেন। বুধবার গভীর রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় এজাহারটি জমা দেন বলে রুনার মামা সাইফুল ইসলাম জানান। তিনি বলেন, এজাহারে অভিযুক্ত ফজলুর রহমান, সমাকল্যাণ বিভাগের দুজন শিক্ষকসহ চার জনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে অন্তর্ভুক্ত অন্যরা হলেন—বিভাগটির সাবেক কর্মচারী ও উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাস, বিভাগটির সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও বিভাগটির আরেক সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান।
কুষ্টিয়া পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘শিক্ষক নিহতের ঘটনায় একটা এজাহার পাওয়া গেছে। মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।’
মর্গের সামনে কথা নিহত শিক্ষকের স্বামী ইমতিয়াজের বড় ভাই আবদুর রশিদ ও শফিকুল ইসলাম জানান, রুনারর ছোট ছোট চারটি বাচ্চা। দুটি বাচ্চা এখনও বুঝতে পারেনি মা নেই। ছোট বাচ্চার বয়স দেড় বছর।
শফিকুল ইসলাম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমাদের পুরো পরিবার ধ্বংস করে দিলো। রুনার বিভাগের নানা আর্থিক বিষয়ে ফজলুর সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল। ফজলু নানা বিষয়ে চাপ দিতো। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রশাসনের কেউ কেউ জানতো। বৈঠকও হয়েছে। কারও ইন্ধন ছাড়া এত বড় ঘটনা ঘটতে পারে না। এত বড় সাহস হতে পারে না। পরিকল্পিতভাবে সবকিছু করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে শিক্ষকরাও জড়িত। এজন্য মামলায় তাদের আসামি করা হয়েছে।’
বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
আসমা সাদিয়াকে হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন তারা। এ সময় দ্রুত হত্যাকারীর ফাঁসি নিশ্চিত ও এর নেপথ্যের কারণ বের করার দাবি জানান তারা।
এর আগে সকাল ১০টার দিকে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের সামনে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রশাসন ভবনের সামনে এসে জড়ো হন।
এ সময় আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবি জানান। দাবিগুলো হলো—হত্যাকারীর ফাঁসি জনসমক্ষে অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করা, হত্যার নেপথ্যের কেউ থাকলে জবাবদিহিতে নিয়ে এসে তার বিচার নিশ্চিত করা, ক্যাম্পাসে-হলে-ডিপার্টমেন্টে সিসি ক্যামেরা নিশ্চিত করা এবং তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষণ করা, স্মার্ট আইডি ছাড়া কাউকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেওয়া, ডেইলি বেসিস কর্মচারীদের নেমপ্লেটসহ আলাদা পোশাকের ব্যবস্থা করা এবং তাদের বেতন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেওয়ার ব্যবস্থা করা, বিভাগীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব পরিষ্কার রাখা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।
সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া সাবরিনা বলেন, ‘আমরা ম্যামের হত্যাকারীর ফাঁসির দাবিতে এখানে এসেছি। ম্যাম আমাদের বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। একজন কর্মচারী কতটা উগ্র হলে রুমে ঢুকে তাকে হত্যা করতে পারে। এ ঘটনার সাক্ষী অনেকেই আছেন, তাই আমরা এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্টু বিচারের দাবি জানাই।’
শিক্ষিকার দাফন সম্পন্ন
শিক্ষক আসমা সাদিয়া রুনার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাদ জোহর কুষ্টিয়ার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে কেন্দ্রীয় পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ সময় কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা, ইবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জানাজায় মুফতি আমির হামজা বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে এই হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাই। আমরা আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেখতে চাই না। যদি অতি দ্রুত এই হত্যার বিচার না হয়, তাহলে এরকম ঘটনা আরও ঘটবে বলে আশঙ্কা করছি।’
এর আগে বুধবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরিকাঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন একই বিভাগের সাবেক কর্মচারী ফজলুর রহমান। খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয়ের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে। পরে তাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিক্ষক আসমা সাদিয়া রুনাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ডাকলে সাড়া দিচ্ছেন চিকিৎসাধীন কর্মচারী
গলায় ছুরির আঘাতে গুরুতর আহত কর্মচারী ফজলুর রহমান সাড়া দিচ্ছেন। কিছু জিজ্ঞাসা করলে তিনি কলম দিয়ে লিখে উত্তর দিতে পারছেন। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম বলেন, ‘ফজলুর রহমানকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা ওয়ার্ডে ভর্তি রাখা আছে। তাকে ডাকলে সাড়া দিচ্ছেন। চোখ মেলে তাকাচ্ছেন। কিছু জানতে চাইলে কলম দিয়ে লিখতে পারছেন। রাতেই পুলিশের কর্মকর্তারা দুই পাতার লিখিত বক্তব্য নিয়ে গেছেন। ফজলুর পরিবার আসছে। তাকে ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।’
বিজ্ঞাপন