বিজ্ঞাপন
ঢাকার ফুটপাতে এক ব্যক্তিকে মারধর ও কান ধরে ওঠবস, নেপথ্যে কী
জাগো বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক তরুণীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে ফুটপাতে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবক ওই ব্যক্তিকে চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারছেন। এ সময় কাছেই দুই পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও তাদের নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।
গত সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোডে অবস্থিত বেসরকারি বাংলাদেশ আই হসপিটালের উল্টো দিকে এ ঘটনা ঘটে।
এক তরুণীকে (২৩) শ্লীলতাহানি করার অভিযোগে হামলার শিকার হন ওই ব্যক্তি। একপর্যায়ে শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ রানা (৪৮) নামের ওই ব্যক্তিকে আটক করে ধানমন্ডি থানা-পুলিশ। পরে ওই ব্যক্তিকে আটক করে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
তবে পুলিশের উপস্থিতিতে মারধর এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২ মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবক রাগ ও ক্ষোভের সঙ্গে গালাগাল করতে করতে ওই ব্যক্তিকে থাপ্পড় ও লাথি মারছেন। এ সময় আশপাশে ভিড় করেন পথচারীরা। তাঁদের কেউ কেউ ঘটনাটি দেখছেন, আবার কেউ কেউ মোবাইলে ভিডিও করছেন।
ভিডিওতে পথচারীদের কথোপকথনের খণ্ডিত অংশ শোনা যায়। তাঁদের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়—‘মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে’, ‘ক্যানটিনে এই ঘটনা ঘটে’, ‘মা-বোন নাই’।
এ সময় এক পথচারী মারধরের শিকার যুবকের কাছে গিয়ে সেখানে উপস্থিত দুই পুলিশ সদস্যকে দেখিয়ে ব্যক্তিটিকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলেন। একপর্যায়ে মারধরের শিকার ব্যক্তিকে বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে দেখা যায়। তার মুঠোফোন নিয়ে এক পথচারী ও মারধর করা যুবক তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় উত্তেজিত যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘কিসের সরি, সরি বললেই সব শেষ হয়ে যায়?’ এরপর তিনি ‘… তুই একটি মায়ের গায়ে হাত দিয়েছিস’ বলে ওই ব্যক্তিকে আবারও থাপ্পড় মারেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, ফুটপাতের এ ঘটনা যখন ঘটছে, তখন কয়েক হাত দূরে দুই পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। আশপাশে ভিড় করা পথচারীদের মতো তাঁরাও ঘটনাটি দেখছিলেন।
ফেসবুকে অনেকে এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একটি পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘আহা-বাংলাদেশ! আহা স্বাধীনতা! আহা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইনের শাসন! পুলিশের সামনেই দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে একজন বাবার বয়সী লোকের উপর মব সৃষ্টি করছে, অথচ পুলিশ দর্শকের মতো ভূমিকা নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখছে?’
অন্য একটি পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, ‘উক্ত ব্যক্তির ভাগনির সঙ্গে খারাপ আচরণ করা সত্ত্বেও পুলিশ কোনো আইনি সাহায্য না করায়, ভুক্তভোগী পরিবার শেষ পর্যন্ত এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে?’
সম্রাট শাহাদত নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে প্রকাশিত ভিডিওটি ৪৬ লাখ বার দেখা হয়েছে। এতে প্রতিক্রিয়া পড়েছে ৬৪ হাজার এবং ভিডিওটি শেয়ার হয়েছে ১১ হাজার বার।
ওই পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘একটা দেশ এভাবে চলতে পারে? পুলিশের কাছে সহযোগিতা না পেয়ে পরিস্থিতির শিকার হয়ে ক্ষমতা হাতে নিয়ে বাপের বয়সী লোকের বিচার করা হচ্ছে!’ এরপর লেখা হয়েছে, ‘বিঃদ্রঃ ভাগনিকে ব্যাড আচরণ করায় মামা পুলিশের অসহযোগিতা পেয়ে এমন বিচার করতে বাধ্য।’
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী তরুণী বলেন, লোকটি তাকে ‘ব্যাড টাচ’ (খারাপ স্পর্শ) করেছে। ঘটনাটির পর ওই ব্যক্তিকে ধরে কর্তব্যরত দুই পুলিশ সদস্যের কাছে নিয়ে গেলে তারা লোকটিকে নিতে অনাগ্রহ দেখিয়ে তাকেই ধানমন্ডি নিয়ে মামলা করতে বলেন। লোকটির কাছে এমন আচরণের কারণ জানতে চাইলে তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে ‘সরি’ বলেছিলেন। পরে মামাকে ফোন করলে তিনি এসে ক্ষুব্ধ হয়ে লোকটিকে মারধর করেন। এরপর পুলিশ এসে লোকটিকে ধানমন্ডি থানায় নিয়ে যায়।
ধানমন্ডি থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মামুন ভূঁইয়া বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে ফোন দিলে তিনি ঘটনাস্থলে যান। এরপর শহীদ আবদুল্লাহকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়।
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব জানান, তরুণীর শরীর স্পর্শ করার ঘটনায় ডিএমপির রমনা জোনের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইমরান আহমেদ অভিযুক্ত শহীদ আবদুল্লাহকে এক মাসের সাজা দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়েছেন। শহীদ আবদুল্লাহ তরুণীকে শ্লীলতাহানির কথা স্বীকার করায় তাঁকে এই সাজা দেওয়া হয়েছে বলে ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান আহমেদ জানিয়েছেন।
ওসি ইমাদুল বলেন, শহীদ আবদুল্লাহকে মারধর করে যুবকটি আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ করেছেন। তাকে খুঁজছে পুলিশ। আর ঘটনাস্থলে থাকা দুই পুলিশ সদস্যের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।
পুলিশ কর্মকর্তা ইমদাদুল বলেন, শহীদ আবদুল্লাহ মোহাম্মদপুর এলাকায় থাকেন। পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি মানসিক রোগী। তিনি এমবিবিএস পড়ার সময় মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। তাঁর বিয়ে হয়েছিল। তবে অনেক আগেই স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন।