স্বীকৃতি পেলে রাখাইনে ফিরতে রাজি রোহিঙ্গারা

জাগো বাংলা ডেস্ক প্রকাশিত: ০৫:২৪ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
স্বীকৃতি পেলে রাখাইনে ফিরতে রাজি রোহিঙ্গারা

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সেনাবাহিনীর নির্যাতের মুখে পালিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় পেলেও, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পেলে নিজ দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী।

রোববার কক্সবাজারের কুতুপালং ও বালুখালী রেজিস্টার্ড ক্যাম্পে ঘুরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে রোহিঙ্গাদের এ মনোভাব জানা যায়। না হলে এভাবেই বাংলাদেশে থাকতে আগ্রহী তারা।

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা নূর জাহান নামে এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, ‘মিয়ানমার আমাদের বাঙালি হিসেবে নির্মম নির্যাতন করেছে। আমাদের চোখের সামনে ঘরের পুরুষদের তিন টুকরা করেছে। আমরা বাঙালি না, আমরা রোহিঙ্গা। মিয়ানমার যদি আমাদের রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তবেই কেবল দেশে ফিরে যাব। না হলে কষ্ট করে এই দেশেই থেকে যাব। বাংলাদেশেই মরব।’

এ সময় তার চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি ও ক্ষোভ লক্ষ্য করা যায়। প্রায় একই মনোভাব তার মতো অনেকেরই।

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে আশ্রয়কেন্দ্র সিগ্যাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে জাগো নিউজের কথা হয় অসংখ্য বয়স্ক নারী ও পুরুষ রোহিঙ্গার সঙ্গে।

‘বাংলাদেশে এসেছেন। রাতে থাকার কষ্ট হচ্ছে। একবেলা খাবার জুটছে, আরেকবেলা জুটছে না। কষ্ট করে থাকছেন। যদি মিয়ানমারে ফেরার সুযোগ হয়, ফিরবেন?’ এ প্রশ্ন শুনে কেউ উত্তর দিয়েছেন, কেউ কেউ হেসেছেন। তবে অনেকে বলেছেন, ‘ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’

একই স্কুলে আশ্রয় নেওয়া ৮৫ বছরের এক বৃদ্ধা জানান, তার নাম হালিমা খাতুন। ঈদের পরদিন (৩ সেপ্টেম্বর) থেকে তারা বাংলাদেশে।

একই প্রশ্ন ফের করা হলো তাকে- ‘ফিরে যেতে চান কিনা?’ আঞ্চলিক ভাষায় তিনি যে উত্তর দিলেন, তার অর্থ দাঁড়ায়- ‘সেখানে যে অবস্থা দেখেছি; কিছু না ভেবে একসঙ্গে ১২ জন নারী আমরা বাংলাদেশে এসেছি। একেক সময় একেক জন আমাকে কাঁধে বহন করেছে। আমাদের ঘরবাড়ি সব পুড়িয়ে দিয়েছে। কিছুই নাই। যদি মিয়ানমারে শান্তি ফেরে, তাহলে আবার মাতৃভূমিতে ফিরে যাব। ঘরবাড়ির দরকার নাই, আমাদের জমিটুকু বুঝিয়ে দিলেই নিজের মতো করে থাকার ব্যবস্থা করে নেব।’

রাখাইনের বুচিদং থেকে ছোট দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে এসেছেন আমেনা খাতুন। কুতুপালং ক্যাম্পের ওমেন্স মেডিকেল সেন্টারের পাশের সড়কে অসহায়ের মতো বসেছিলেন তিনি। কোলে দেড় বছরের ছেলে রহিমুল্লাহ। রহিমুল্লাহর কানে ঘাঁ হয়েছে। চিকিৎসক দেখিয়েছেন। পাশেই আমেনার মেয়েটি ছোট ভাইয়ের ওষুধ হাতে বসে আছে। আমেনার সামনে যেতেই ভাবলেন, হয়তো ত্রাণ দিতে বা ত্রাণের তালিকা প্রস্তুতের কাজে গিয়েছি। তার সামনে যেতেই জানালেন, খুব কষ্টে আছেন। ক্যাম্পের ভেতরে কেউ খাবার নিয়ে যায় না। তাই রাস্তায় বসে আছেন।

আমেনা বলেন, ‘এখানে এত কষ্ট, সুযোগ হলে দেশে ফিরবেন কি?’ উত্তরে বললেন, ‘ইতারা শান্তিমতো থাইকতে দিলে আরা যাইয়ুম জন্মভূমিত। (তারা শান্তিতে থাকতে দিলে আমরা জন্মভূমিতে ফিরে যাব।’

রাখাইনের আটিপাড়া থেকে ৯ সেপ্টেম্বর স্ত্রী আর ৫ সন্তানকে নিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন নজীর আহমেদ। তিনি জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতের আধারে তাদের ঘরে আগুন দেয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তারা কোনোমতে বের হতে পারলেও তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে ঘুমের মধ্যেই পুড়ে মারা যায়। তাদের মরদেহ সেখানে রেখেই রওনা হন বাংলাদেশের দিকে। এখানে এখন তাদের অবস্থা আরও খারাপ। যদি সেদেশে শান্তি ফেরে, তবে সেখানেই ফিরে যাবেন।

জাগো নিউজের আলাপকালে ওই ক্যাম্পের অনেকে জানান, তারা এখনই মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি নয়। অনেকে ‘ভবিষ্যতে’ পরিস্থিতি দেখে যাওয়ার বিষয়ে ভাববেন বলে জানান।

রাখাইনে দমন-পীড়নের শিকার হয়ে ১৯৭৮ সালে প্রথম বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় রোহিঙ্গারা। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে তারা এসেছে। এরপর প্রায় সাড়ে ৩ দশকে নানা সময়ে আরও প্রায় ৫ লাখের মতো রোহিঙ্গা এসে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে।

সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের মুখে পালিয়ে এখন পর্যন্ত নতুন করে আরও ৪ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা এসেছে বাংলাদেশে।

আগে আসা অনেককে ফিরিয়ে নিলেও বর্তমানে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করছে মিয়ানমার। ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ দাবি করে ফিরিতে নিয়ে অস্বীকৃতি জানিয়ে রাখাইন থেকে তাদের উচ্ছেদ অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমার।

এআর/এসআর/জেএইচ